সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় অঞ্চল আজ এক দৃষ্টান্তহীন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সিডর ও আইলার মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসলীলার ক্ষত এখনও শুকায়নি, তার ওপর প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নদীভাঙন, লবণাক্ততার আক্রমণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের নানা নেতিবাচক প্রভাব। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে মানুষের প্রকৃতিবিধ্বংসী কার্যকলাপ- দুই মাত্রার আঘাতে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ ধুঁকছে।
উপকূলে পানি উন্নয়ন বোর্ডনির্মিত বেড়িবাঁধগুলো ভাঙনের ফলে লবণপানি দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে আবাসভূমি ও চাষের জমিতে। লবণাক্ততায় নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমি, বিনষ্ট হচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা। যে মানুষ বংশপরম্পরায় মাছ ও ফসলের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল, তারা আজ পেশা হারিয়ে ভিড় করছেন বড় শহর-নগরে। জীবন-জীবিকার এই ট্র্যাজেডি দিন দিন গভীরতর হচ্ছে।
যারা এখনও বাস্তুভিটায় কোনোমতে টিকে আছেন, তাদের জীবন হয়ে পড়েছে ভয়াবহ রকমের কঠিন। লোনা পানিতে মাছের রেণু আহরণ করে যারা সংসার চালান, তারা ভুগছেন নানা চর্মরোগে। দিনমান পরিশ্রম করে যে আয় হয়, তার বেশিরভাগই চলে যায় ওষুধ কিনতে। আর পুষ্টির অভাবে উপকূলের শিশুরা হচ্ছে লিকলিকে, রোগবালাইতে আক্রান্ত হচ্ছে সহজেই।
গেল শনিবার দৈনিক সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত ‘পুষ্টি ঘাটতিতে উপকূলবাসী’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি এই বাস্তবতার এক জ্বলন্ত দলিল। মাংসের মতো প্রয়োজনীয় খাবার ‘কালেভদ্রে চোখে দেখা’র যে বাস্তবতা, তা যেকোনো সচেতন মানুষকেই নাড়া দেয়।
এখন প্রশ্ন, এই অবস্থার জন্য কে দায়ী? কেবল প্রকৃতি, নাকি আমরা নিজেরাও? জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা, কিন্তু উপকূলে ভাঙন প্রতিরোধে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে, বেড়িবাঁধ মেরামত, লবণসহিষ্ণু ফসলের প্রচলন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ করতে পারলে বিপর্যয় অনেকখানিই রোধ করা যেত। উপকূলীয় মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা এখন সময়ের দাবি।
এই বিষয়ে প্রধানত সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও’র ওপর ভরসা করে কিছু অর্জন করা যাবে না। গালভরা বুলিসর্বস্ব এনজিওগুলো শেষ বিচারে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে এক কদমও হাঁটবে না। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।
মনে রাখা দরকার, উপকূলবাসী শুধু টিকে থাকা নয়, স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার রাখে। ‘বিপন্ন’ উপাধি ঘুচিয়ে তাদের ‘সক্ষম’ করে তোলার দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্রের। নইলে এই বিপুল ক্ষর্মক্ষম মানুষ অকর্মণ্য হয়ে জাতির কাঁধের বোঝায় পর্যবসিত হবে। আজ যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, কাল আমাদের দিতে হবে আরও কঠিন মূল্য।