রাসেল মাহমুদ
, যশোর
বাংলার চিরায়ত কৃষি ঐতিহ্যে ভোরের কুয়াশাভেজা মাঠে কৃষকের ‘হেঁইও’ ডাক আর লাঙল-জোয়াল কাঁধে গরুর ধীরলয় ছিল এক অবিচ্ছেদ্য দৃশ্য। কিন্তু সময়ের আবর্তে ও যান্ত্রিকতার যুগে সেই চিরচেনা দৃশ্যে এসেছে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। যেখানে একসময় রাজকীয় সওয়ারি হিসেবে ঘোড়ার কদর ছিল আকাশচুম্বী, সেই তেজস্বী ঘোড়া এখন কাদা-জলে ভরা ফসলের মাঠে লাঙল-জোয়াল টানছে।
যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি এলাকায় গেলে চোখে পড়বে আভিজাত্যের প্রতীক ঘোড়ার এই মেহনতি রূপ। এই পরিবর্তনের কারিগর স্থানীয় ঘোড়া মালিক আব্দুর রহিম। ঘোড়া রাজকীয় প্রাণী হলেও বর্তমান সময়ে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার কমে যাওয়ায় তিনি বিকল্প চিন্তা থেকে একে হালের গরুর বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
আব্দুর রহিম বলেন, ‘প্রথমে ভাবিনি কাদা-পানিতে হালচাষের মতো কঠিন কাজ ঘোড়া দিয়ে সম্ভব হবে। ঘোড়াকে প্রশিক্ষিত করা ছিল এক অবিশ্বাস্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আজ আমি সফল।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বর্তমানে বাজারে হালের গরুর দাম আকাশচুম্বী, যা প্রান্তিক কৃষকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সেই তুলনায় ঘোড়ার দাম অনেকটা কম, অথচ এর শক্তি ও কর্মক্ষমতা গরুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আজিজ ও ফারুক হোসেন জানান, জমি চাষের পর তা সমান বা ‘বাঁশই’ দিতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী গরু দিয়ে প্রতি বিঘা একবার সমান করতে ৪০০ টাকা এবং দুইবারের জন্য ৮০০ টাকা ব্যয় হয়। এই একই কাজ ঘোড়া দিয়ে করলে খরচ হচ্ছে অর্ধেক।
সাশ্রয়ী হওয়ায় এলাকার অনেক কৃষকই এখন এই পদ্ধতিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। যদিও এই সংখ্যা এখন পর্যন্ত কম, তবে কৃষকদের ধারণা, ঘোড়াকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষি কাজে আরও বেশি ব্যবহার করা গেলে এটি গরুর একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় বিকল্প হয়ে উঠবে।
সাগরদাঁড়ি এলাকায় ঘোড়া দিয়ে হালচাষের এই দৃশ্য দেখতে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এক সময় ঘোড়া কেবল বিয়ে বা মেলায় আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে টিকে থাকার লড়াইয়ে আভিজাত্য এখন মাঠের শ্রমে বিলীন হয়েছে।
আব্দুর রহিমের এই উদ্ভাবনী চিন্তা প্রান্তিক চাষিদের জন্য এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে আভিজাত্যকেও হার মানতে হয় জীবনযুদ্ধের কাছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি কৃষকদের এই নতুন পদ্ধতিতে সহায়তা বা প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে কৃষি অর্থনীতিতে এটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।