গাজা সিটিএ চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। যুদ্ধের ক্ষত এখনও শুকায়নি। ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন শরণার্থী শিবিরে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও বিদ্যুতের সংকট যেন নিত্যসঙ্গী। এমন কঠিন বাস্তবতার মাঝেও গাজার মানুষের কাছে কিছুক্ষণের স্বস্তির নাম এখন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬।
দীর্ঘদিনের সংঘাত আর অবরুদ্ধ জীবনের মধ্যে ফুটবল যেন হয়ে উঠেছে এক টুকরো মুক্তির জানালা। টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছেন গাজার মানুষ।
গত বছরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এখনও ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। ফলে অধিকাংশ মানুষের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, আবার বাইরের মানুষও সহজে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না। এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপই এনে দিয়েছে আনন্দ ভাগাভাগির নতুন উপলক্ষ।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অস্থায়ী ক্যাফে ও খোলা আকাশের নিচে ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকলেও উৎসাহে ভাটা পড়েনি। কোথাও বিদ্যুৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে বসে থেকেছেন দর্শকরা, আবার কোথাও বালুর ওপর প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে শিশু থেকে প্রবীণ- সবাই একসঙ্গে উপভোগ করেছেন বিশ্বকাপের লড়াই।
সম্প্রতি বেলজিয়াম ও মিশরের ম্যাচে প্রিয় তারকা মোহাম্মদ সালাহর গোলের আশায় প্রার্থনায় মেতেছিলেন অসংখ্য দর্শক। শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল না এলেও হতাশ হননি তারা। ম্যাচ শেষে বন্ধুদের কাঁধে উঠে উল্লাস করেছেন কেউ, কেউ আবার মিশরের পতাকা উড়িয়ে ফুটবলের প্রতি নিজেদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুস্তাফা সিয়াম বলেন, ‘গাজার মানুষের কাছে বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি তাদের জন্য দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার, মানসিক শক্তি ফিরে পাওয়ার এবং কিছুটা স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি ফিরে পাওয়ার একটি উপলক্ষ।’
একজন ফুটবলপ্রেমী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘ফুটবল আমাদের সবার প্রিয়। তাই সুযোগ পেলেই বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখি। তবে জীবনে কোনো দিন বিশ্বকাপের ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে দেখার সুযোগ হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। এটা আমাদের স্বপ্ন, কিন্তু গাজার বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন দেখাও যেন বিলাসিতা।’
যুদ্ধ মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎকে বদলে দিয়েছে। তবুও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা মুছে দিতে পারেনি। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ গাজার মানুষের কাছে হয়ে উঠছে আশা, ঐক্য এবং সাময়িক স্বস্তির এক অনন্য প্রতীক। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ফুটবল তাদের ভুলিয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা এবং মনে করিয়ে দিচ্ছে- জীবন এখনও থেমে যায়নি।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক মিডিয়া