যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

সুন্দরবন রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ বিবেচনা করতে হবে

প্রকাশ : সোমবার, ১০ আগস্ট,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
সুন্দরবন রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ বিবেচনা করতে হবে

সুন্দরবন বাংলাদেশের গৌরব, উপকূলে প্রাণপ্রাচুর্যের ভাণ্ডার এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতির অমূল্য দান। এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মৎস্য প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছর পহেলা জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা একটি সময়োপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের মধ্যদিয়ে আমরা এক জটিল দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছি। একদিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের আবশ্যকতা, অন্যদিকে লক্ষাধিক বনজীবীর জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।

সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য প্রজনন মৌসুমে তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, এই তিন মাসে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন হার বহুগুণ বেড়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা না থাকলে এই সময়ে অতিরিক্ত আহরণ ভবিষ্যতের মৎস্যসম্পদকে হুমকির মুখে ফেলবে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে জেলেদেরই ক্ষতির কারণ হবে। তাই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকে স্বাগত জানাতেই হবে।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞার এই সময়টিতে কিছু অসাধু চক্র সুযোগ নিচ্ছে বিষ প্রয়োগে মাছ-কাঁকড়া শিকার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের। বিষ প্রয়োগে মাছ আহরণ কেবল অবৈধ নয়, এটি জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিষের প্রভাবে শুধু মাছ নয়, অসংখ্য অন্যান্য জলজপ্রাণীও মারা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খলকে বিঘ্নিত করে এবং প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক এই কারণে যে, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী মহলের মদদ থাকার অভিযোগ রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়া প্রকৃত মৎস্যজীবীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। নিষেধাজ্ঞাকালে এসব পরিবার প্রতিশ্রুত ৮০ কেজি চাল এখনো না পাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যখন জেলেরা আইন মেনে ঘরে অবস্থান করছেন, তখন তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায় ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার প্রবণতা কমে যেতে পারে; যা সুন্দরবন রক্ষার উদ্যোগের জন্যই ক্ষতিকর।

সুন্দরবন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সফলতা নির্ভর করছে প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও শিকার বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ। বিষয়টি শুধু বন বিভাগের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এতে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ ও উপকূলীয় জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিষিদ্ধ সময়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ও আশপাশের নদী-খালে নিয়মিত টহল বাড়াতে হবে। যারা বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বৈধ জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা। ৮০ কেজি চাল দ্রুত বিতরণের পাশাপাশি, তিন মাসের জন্য নগদ সহায়তা, ক্ষুদ্রঋণ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অনেক জেলে মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজে অভিজ্ঞ নন; তাদের জন্য বনায়ন, হস্তশিল্প বা মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। যদি জেলেরা দেখেন যে, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ফলে তাদের টিকে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, বরং সরকার তাদের পাশে আছে, তবে তারা স্বেচ্ছায় নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবেন।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি কোটি মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও আবেগের অংশ। এখানকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার একদিনে লাভ করলেও সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদকে ধ্বংস করে দেয়; যার মূল্য পরিশোধ করতে হবে আগামী প্রজন্মকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বুক পেতে দিয়ে মানুষকে রক্ষা করে। এর বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হলে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ হবে জলবায়ু উদ্বাস্তু। তাই সুন্দরবন রক্ষার উদ্যোগকে কেবল প্রশাসনিক বা আইনগত বিষয় হিসেবে না দেখে, এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

জেলেরা শুধু সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলই নয়, তারাও এই সম্পদের রক্ষক। তাই যেসব জেলে আইন মেনে চলবেন, তাদের রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)