যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আনন্দ শোভাযাত্রা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, দ্বীন-ই-ইলাহী ও ইসলাম

মোঃ শামীম ইকবাল (লিপন)

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল,২০২৬, ১০:০০ এ এম
আনন্দ শোভাযাত্রা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, দ্বীন-ই-ইলাহী ও ইসলাম

মহান আল্লাহর প্রেরিত ধর্ম হলো ইসলাম; এর প্রতিষ্ঠাতা কোনো মানুষ না। রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে। কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলাম ধর্মের সম্পূর্ণ এখতিয়ার বা প্রবর্তক একমাত্র আল্লাহ স্বয়ং, যা কোনো মানব প্রবর্তিত মিশ্র ধর্ম বা মতবাদ নয়। একক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস বা তাওহিদ ইসলামের প্রধান ও একমাত্র শর্ত। কোরআন আল্লাহ প্রদত্ত ঐশীগ্রন্থ, যা শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয়। কোরআন হলো এমন এক গ্রন্থ যার মাঝে মহাবিশ্ব, বিশ্ব, মানুষ, প্রাণিসহ আল্লাহর সকল সৃষ্টি ও সৃষ্টির জন্য দিক নির্দেশনা- যার কিছু অংশ স্পষ্ট এবং কিছু অংশ রূপক হিসেবে লিপিবদ্ধ। যেসব বিষয় সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ ব্যতিত অন্য কেউ জানেন না, জানতেও পারে না। এ বিষয়ে কোরআনের কয়েকটি আয়াতে উল্লেখ আছে। ইসলামে কলেমা, নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ- এই পাঁচটি স্তম্ভ ¯পষ্টভাবে নির্ধারিত। যুগে যুগে বিভিন্ন কওমের জন্য একাধিক নবীকে প্রেরণ করা হলেও ইসলামের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহর প্রেরিত নবুয়তপ্রাপ্ত হন মুহাম্মদ (সা.), তিনি শেষ নবী এবং বিশ্বনবী।

ইসলাম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্ম, এর অনুসারী কোটি কোটি মানুষ। ইসলাম মানবজাতির হেদায়াত, ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা, আল্লাহর ইবাদতের জন্য ১৪ শত বছরের অধিক কাল ধরে অপরিবর্তনীয়ভাবে সত্য, সঠিক ও পূর্ণ ধর্ম বা মতবাদ হিসেবে পালিত হচ্ছে। ইসলামে ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা ধর্মীয় নীতির অংশ হিসেবে কোনো রাজকীয় মিছিল বা পদযাত্রা নেই। ইবাদত সরল ও বিনয়পূর্ণ, কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা নেই। ধর্মীয় মহিমা প্রদর্শনের জন্য সরব জমায়েত বা মিছিল, শোভাযাত্রা ইসলামের মূল আচারবহির্ভূত। ইসলাম ধর্মে ইবাদত করার লক্ষ্যে নাচ-গানের কোনো রীতি নেই। নাচ ধর্মচর্চার স্বীকৃত অংশ নয়; গান-সঙ্গীত স¤পর্কে ইসলামে বিভিন্ন শরঈ মত আছে, তবে অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় বা গুনাহের দিকে ধাবিত হলে ইসলামে নিষিদ্ধ ধর্মীয় আচার হিসাবে গান-নাচ গন্য হয়; যা ¯পষ্টতই ধর্মীও রীতির বরখেলাফ। ইসলামের আধ্যাত্মিকতা মূলত তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, ইবাদত, সৎকর্ম- এসবের মাধ্যমে। ইসলামে মানুষ-পূজা, নবী-পূজা, রাজা-পূজা, আল্লাহর সৃষ্টিকে পূজা, বস্তু পূজা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে ধর্মীয় ভক্তি প্রকাশ করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষেধ। ধর্মের কেন্দ্র একমাত্র আল্লাহ। ইসলাম সব ধর্মের মানুষের প্রতি ন্যায়-নীতি শিক্ষা দেয়। কিন্তু ইমান, ইবাদত, আচার-আচরণে কোনো মিশ্র প্রথা গ্রহণ করার অনুমতি নেই। ধর্মীয় শুদ্ধতা-তাওহিদ ও সুন্নাহ বজায় রাখা ইসলামের মৌলিক নীতি।

হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভারতবর্ষের মোঘল সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা হিসেবে মসনদে অধিষ্ঠিত হন আকবর। তিনি ১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিব্দ পর্যন্ত ৪৯ বছর যাবত ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন। মূলত তার শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বৈরম খান বা খাঁ। সম্রাট আকবর মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভূমি, অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক সর্বক্ষেত্রেই প্রতিভার স্বাক্ষর প্রতিভাত হয়। পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতিতেও উজ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হন।

আকবর ইসলাম, হিন্দু, জৈন, খ্রিস্টান, জরথুস্ত্র ধর্মের উল্লেখযোগ্য উপাদানের সংমিশ্রণে দ্বীন-ই-ইলাহী নামে একেশ্বরবাদী মিশ্র মতবাদ বা ধর্মের প্রবর্তন করেন। মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং আকবর তার সাম্রাজ্যকে সংহত করতেই এ মিশ্র মতবাদের প্রচলন করেন। অল্প কিছু মানুষ এই দ্বীন-ই-ইলাহী ধর্মের অনুসারী ছিল। তার মৃত্যুর পর তার প্রবর্তিত ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়। আকবরের দরবার ও নগরগুলোতে বছরের বিশেষ দিনগুলোয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, রাজকীয় উপস্থাপনা, স্তুতি, আতশবাজি, প্রদীপ প্রজ্বালন, সঙ্গীত পরিবেশন, নাচ-গানসহ উৎসবমুখর আয়োজন করা হতো। আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীতে সঙ্গীত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দখল করেছিল। আকবর ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী; তার দরবারে ওস্তাদ তানসেনসহ বহু সঙ্গীতজ্ঞ রাজদরবার আলোকিত করে রাখতো। ধর্ম চর্চার অংশ না হলেও আধ্যাত্মিক অনুভূতি জাগাতে, উৎসব এবং রাজকীয় সমাবেশে গান-বাদ্য-নৃত্যের প্রচলন অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক সঙ্গীত, ভারতীয় ভাবসঙ্গীত, সুফি সঙ্গীত, হিন্দু ভাবনার সুর সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের মিশ্র সাংস্কৃতিক চর্চা চালু করা হয়েছিল। উৎসব ও অনুষ্ঠান উদযাপনের ক্ষেত্রে দ্বীন-ই-ইলাহীতে বিভিন্ন ধর্মের উৎসব থেকে নির্বাচিত উপাদান নিয়ে মিশ্র রীতির প্রবর্তন করা হয়- হিন্দুধর্মের দীপাবলি বা হোলির রঙ-উৎসবের অনুপ্রেরণা, পারস্যদেশীয় নওরোজ থেকে বর্ষবরণ, জৈন-বৌদ্ধদের শান্তি-অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। এগুলোকে আধ্যাত্মিকতা ও সাম্রাজ্যের ঐক্যের বন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। ধর্মীয় প্রতীক ও ব্যক্তিপূজার দিক থেকে দ্বীন-ই-ইলাহীতে আকবরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো এবং তিনি ছিলেন ধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র। কতিপয় অনুসারী আকবরকে আধ্যাত্মিক নির্দেশনার উৎস মনে করে প্রচার করতো। সকল অনুষ্ঠানগুলোতে আকবরকে বিশেষ সম্মান জানানোর প্রথা অব্যাহত ছিল। ধর্ম ও সামাজিক সম্প্রীতির ধারণা হিসেবে দ্বীন-ই-ইলাহী ছিল বহুধর্মীয় সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র। আকবর ‘সুলহ-ই-কুল’ সবার প্রতি ন্যায়-নীতি প্রচলন করেন। আচার-অনুষ্ঠানে বহুজাতিক রঙ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রাখা হয়। শোভাযাত্রা ও রাজকীয় আচার আকবরের ইবাদতখানায় বৈঠকের সঙ্গে বিশেষ অনুষ্ঠান, আলো, প্রদীপ, আতশবাজি, শোভাযাত্রা প্রবর্তন করেন। আকবরের জন্মদিন, নওরোজ, পূর্ণিমার বিশেষ দিন ইত্যাদিতে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, হাতি-ঘোড়ার সাজসজ্জা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো অন্তর্ভুক্ত ছিল। আকবর নিজেকে ‘জিল-এ-ইলাহী’ ঈশ্বরের ছায়া মর্যাদাস¤পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তাকে ঘিরে বিশেষ আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হতো। ধর্মীয় আচারের সঙ্গে রাজকীয় জাঁকজমক মিলিয়ে উৎসব পালন করা এসব আয়োজন অনেকাংশে হিন্দু রাজসভা, মোঘল দরবার, পারস্যের ঐতিহ্য এবং জৈন-বৌদ্ধ শান্তিপূর্ণ আচার মিশ্রিত ছিল। গান বা সঙ্গীতকে আধ্যাত্মিকতার চেতনা জাগানোর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা- হিন্দু ধ্রুপদী সঙ্গীত, সুফি সঙ্গীত, এমনকি জরথুস্ত্রী গাথাও ব্যবহার করা হতো। তানসেন, বৈজু বাওরা প্রমুখ ছিলেন আকবরের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের রাজ ব্যক্তিত্ব। রাজসভায় নিয়মিত নাচ ও নাটক সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছিল। দ্বীন-ই-ইলাহীর সামাজিক দর্শন এই সাংস্কৃতিক মুক্ত পরিবেশনাকে সমর্থন করতো। এটা ধর্মীয় আচার না হলেও আদতে ছিল ধর্মীয় পরিবেশের অন্যতম দিক। বহুধর্মের উৎসব পালনের মাধ্যমে আকবর চেয়েছিলেন ধর্মীয় পার্থক্যকে মুছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তুলতে। তার সাম্রাজ্য সুসংহত এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে উঠলেও একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠায় দ্বীন-ই- ইলাহী ছিল পুরোপুরি ব্যর্থ।

বিলুপ্ত এই দ্বীন-ই- ইলাহী ধর্মের রীতি-নীতি ইসলামের মূল স্তম্ভের পরিপন্থী এবং নিজেকে আল্লাহর ছায়া এবং ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে ঘোষণা করা ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে কাফেরের শামিল। আকবরের এ সকল কর্মকাণ্ড আইন-ই-আকবরি, আকবরনামা, মুনতাখাব-উৎ-তাওয়ারিখ, The Mughal Empire, Akbar and His India, Religious Policy of Akbar, The Mughal Court and Culture, মোঘল সাম্রাজ্য, আকবর মহিমা, বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস প্রভৃতি গবেষণামূলক ও ইতিহাস বইতে সাক্ষ্য বহন করছে।

ভারতবর্ষে সুসংহত মোঘল শাসন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক স্বতন্ত্র শাসন- এক রাজ্য কর্তৃক আর এক রাজ্যের ওপর হামলা, আক্রমণ, লুটতরাজ। বিশৃংখল এই পরিস্থিতির সুযোগে বহু ধর্মের সম্প্রীতির ভারতবর্ষ আক্রমণ করে ইংরেজ শাসন শুরু হয়। স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মের লোভী ও স্বার্থপরদের সহায়তায় মোঘল শাসন পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘটে। ১৯০ বছরের ইংরেজ শাসন-শোষণের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধর্মের বন্ধন ছিঁড়ে যায়। ভারতের জনগণ এ সময় উপলব্ধি করে ইংরেজদের আসল চরিত্র। কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ইংরেজদের কূটকৌশলে ভারত সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান এবং বাংলা বিভক্ত হয়ে পশ্চিম ও পূর্ব বাংলা পরিচয় বহন করে। যার পূর্ব বাংলা ইসলাম ধর্মের আধিপত্যের কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের- ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান নামে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ভারতের রাজনৈতিক চতুরতা আর পাকিস্তানের নির্বুদ্ধিতা এবং ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের প্ররোচণায় পূর্ব-পাকিস্তানে গণহত্যা-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় নতুন এক দেশ- বাংলাদেশ।

এই বাংলাদেশে ঊনিশ শতকের শেষার্ধের আগে থেকে পালিত হওয়া বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানমালা- মেলা, হালখাতা, নতুন ফসল সংগ্রহের সাথে যুক্ত হয় বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। বাংলা বর্ষের প্রথম বৈশাখের প্রভাতে বিভিন্ন উপকরণ- হাতি, ঘোড়া, পেঁচা, বাঘ-হরিণের মুখোশ, পুতুল, ঢাক-ঢোল, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে এবং নানান সাজসজ্জা করে মানুষের সরব পদযাত্রা করা হয়; যা মূলত সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী থেকে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করা হয়। অনেককে প্রচার করতেও শুনা যায়, এটা ইসলামি রীতি বলে, যা আকবর পালন করতেন। কিন্তু আকবর তার শাসনকে সুসংহত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মের কিছু উপাদানের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভারতবর্ষের প্রধান জাতিসমূহকে নিয়ে এক নতুন ধর্ম প্রবর্তন করে নিজেকে আল্লাহর ছায়া হিসেবে জাহির করেন; যা ¯পষ্টতই ইসলাম অবমাননার শামিল। ফলে তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে কাফের। এহেন একজন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করে মুসলিমদের রেওয়াজ বলে চালানো ধর্মীয় রাজনীতির সূক্ষ্ম কূটকৌশল হিসেবেই প্রতিভাত হয়। উল্লিখিত আনন্দ শোভাযাত্রা পরবর্তীতে মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে প্রবর্তিত হয়ে বিশ্ব হেরিটেজ হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে দেশের সংস্কৃতির অন্যতম অনুষ্ঠান হিসেবে পালিত হয়।

বস্তুত মঙ্গল শব্দের আভিধানিক অর্থ ভালো, উত্তম, উৎকৃষ্ট, কল্যাণকর, শ্রেষ্ঠ প্রভৃতি। কিন্তু এখানে ‘মঙ্গল’ শব্দটি একটি ধর্মের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে: মঙ্গলকাব্য, মনসামঙ্গল, মঙ্গলপ্রদীপ, মঙ্গলসূত্র ইত্যাদি; যা ধর্মীয় রীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এদেশে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন মুসলিম পরিবারের কিছু মানুষ, যারা নিজেকে অতি আধুনিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিজীবী পরিচয় দিয়ে থাকেন। সর্বোপরি ইসলাম স¤পর্কে স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী এ মানুষগুলো মূলত ইসলামের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে থাকেন। তাদের অনেকে আবার নিজেদেরকে নাস্তিক হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং গর্ব বোধ করেন। নাস্তিক হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ, ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে বিশ্বাস করে না, নাস্তিকতা মূলত একটি পৃথক দর্শন ও চিন্তাধারা; যেখানে মানুষ মনে করে যে, বিশ্বজগৎ কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির সৃষ্টি নয় বরং প্রাকৃতিকভাবে ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে গঠিত।

নাস্তিকরা সাধারণত ধর্মীয় বিশ্বাস, আসমানি গ্রন্থ এবং কোনো অলৌকিক ঘটনাকে গ্রহণ করে না বা মান্য করে না। তারা যুক্তি, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সত্য যাচাইয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে। নৈতিকতা, ভালো-মন্দ, মানবিক বিবেক ও সামাজিক চুক্তিগুলো ধর্মের বাইরে থেকেই গড়ে উঠতে পারে। নাস্তিকতা মানেই ধর্মবিদ্বেষ নয়। অনেক নাস্তিক মানুষ ধার্মিকদের সম্মান করে থাকে, কিন্তু আল্লাহ বা ঈশ্বরের ধারণা গ্রহণ করে না। সহজ ভাষায় বলা যায়, যেব্যক্তি আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নয় তাকে নাস্তিক বলে। যদিও বাংলাদেশের নাস্তিকরা স্পষ্টতই ধর্মবিদ্বেষী এবং শুধুমাত্র ইসলামবিদ্বেষী এবং একে তারা আধুনিকতা মনে করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বহু ধর্মের মধ্যে অন্য কোনো ধর্মেও মানুষকে নাস্তিক হতে দেখা যায় না বা প্রচার করতে দেখা যায় না।

একবিংশ শতাব্দীর এই মধ্যভাগে ভারতের পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে ফসলি বছরের যে প্রবর্তন সম্রাট আকবর করেছিলেন তা বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বাংলা সন হিসেবে গণ্য হয়। শুরুতে গ্রামবাংলার কৃষকের বৃহৎ অংশ জমির খাজনা পরিশোধ, ধার দেনা পরিশোধ করার জন্য নতুন ফসল ঘরে উঠার পর হালখাতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পরবর্তীতে ১৯ শতকের মধ্যভাগে বাংলায় ১ বৈশাখে বাংলা বর্ষবরণ ও গ্রাম্যমেলার প্রচলন শুরু হয়, যার ছোঁয়া শহরেও লাগতে থাকে। মূলত এটা আকবরের মৃত ধর্ম দ্বীন-ই-ইলাহীর পার্সিয়ানদের নওরোজ উৎসব থেকে অনুপ্রাণিত। একইভাবে এই শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলা বর্ষবরণের সাথে যুক্ত হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। যার সূচনা বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা হলেও তা ২-৩ বছরের ভিতর রাজধানী ঢাকায় জাঁকজমকভাবে পালিত হয় এবং ধীরে ধীরে তা আনন্দ শোভযাত্রা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে কোনো কারণে নাম পরিবর্তন হয়ে লোক দেখানো অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। যার মাঝে সূচনালগ্নে যে আত্মিক উচ্ছ্বাসের প্রকাশ ঘটেছিল তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আকবরকে ইসলামের একনিষ্ঠ ধারক হিসেবে প্রচারের মাধ্যমে নানান ধর্মের মিশ্র উৎসবকে ইসলামের উৎসব বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়; যা ইসলামের মূলনীতিবিরুদ্ধ এবং স্পষ্টতই ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী।

বাংলাদেশ কাগজে-কলমে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। তথাপি এই দেশে সকল ধর্মের মানুষ পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে সৌহার্দ বজায় রেখে বসবাস করে। মানুষের মাঝে ভাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সামাজিক শৃংখলার যে বিরল দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত তা অনেক দেশেই অনুপস্থিত। মঙ্গল শোভাযাত্রার ’মঙ্গল’ শব্দটি ৯৩% মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে কিঞ্চিৎ হলেও অস্বস্তির সৃষ্টি করে। সে কারণে বাংলা বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম পরিবর্তন করে সূচনার আনন্দ শোভাযাত্রা পালিত হওয়া আবশ্যক। অতি সম্প্রতি এই আনন্দ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে সংস্কৃতিমন্ত্রী বৈশাখী শোভাযাত্রা নামকরণ করেছেন; যা দেশের সকল ধর্মের মানুষের সম্প্রতি বন্ধনে সময় উপযোগী পদক্ষেপ। প্রসঙ্গত, কিছু সাংস্কৃতিক কর্মী/ব্যক্তি বৈশাখী শোভাযাত্রা নামকরণে বিরোধিতা করে ধর্মীয় সম্প্রতি বিনষ্ট করার লক্ষে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করে চলেছেন। এমনকি বাংলা মাস বৈশাখ নামকরণের ক্ষেত্রেও একটি ধর্মের পক্ষের নাম ভাঙিয়ে বিশৃংখলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। সে কারণে বাংলা মাস বৈশাখ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের পরিচ্ছন্ন ইতিহাস জানা প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে বছরের মাসগুলোর নামকরণ পূর্ণিমার রাতে চন্দ্রের নিকটতম নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে করা হয়। তেমনি একটি নক্ষত্র ‘বিশাখা’। বৈশাখ মাসে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ বিশাখা নামক নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থান করে থাকে। সংস্কৃত বিশাখা শব্দ থেকে বৈশাখ নামের উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন গ্রন্থে কোথাও কোথাও একে ‘বৈশাখ’বা ‘বৈশাথ’ উল্লেখ করতে দেখা যায়। (সূত্র : বঙ্গভাষা ও সাহিত্য : দীনেশচন্দ্র সেন, বাংলা সনের ইতিহাস: ড. শামসুজ্জামান খান ও অমর কোষ (শব্দার্থ-প্রাচীন সংস্কৃতির অভিধান)

মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে বাৎসরিক খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ মতান্তরে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর কর্তৃক পঞ্জিকার সংস্কার করে হিজরি চান্দ্রবর্ষ পঞ্জিকা সমন্বয় করা হয়; যা ফসলি সন নামে প্রবর্তিত হয়েছে। এই নতুন বছরের মাসিক পরিক্রমা বৈশাখকে প্রথম মাস বা বর্ষবরণ মাস হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এ থেকে দেখা যায়, এই বাংলা বৈশাখ মাস কোনো একক ধর্মের প্রবর্তিত নাম নয়। প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী বিশাখা নক্ষত্রটি অত্যন্ত শুভ গণ্য করা হতো। সে কারণেও এই বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় এখনও সেটি চলমান এবং এর প্রথম দিনে নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে হালখাতা, নবান্ন, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন বাঙালি আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়ে থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, সম্রাট আকবরের ইসলাম, সনাতন, বৌদ্ধ, জরথুস্ত্র ধর্মের প্রধান উপাদান থেকে নেওয়া মতবাদের আলোকে গঠিত দ্বীন-ই-ইলাহী ধর্ম থেকে, বাংলা তথা বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি না হলেও সুদীর্ঘ কাল ধরে পালিত হয়ে আসছে, সেকারণে তা পরিশীলিত ও অশ্লীলতা বর্জন করে আগামিতে পালন করার আকাক্সক্ষা পোষণ করি। সৌন্দর্য্য, সৌহার্দ, সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বমহিমায় বিশ্বদরবারে জায়গা করতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: অধ্যক্ষ, এসএম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজ, যশোর
*মতামত লেখকের নিজস্ব

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)