যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

দেয়ালে উঠে লিখুন

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল,২০২৬, ১০:০০ এ এম
দেয়ালে উঠে লিখুন

যে কোনো বিবেচনায় আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা বাস্তববাদী এবং টনটনে পাটোয়ারি বুদ্ধির অধিকারী। এ কারণে তারা দেয়ালে ওঠেন না এবং উঠতেও চান না। তাঁরা খুব ভালো করেই বোঝেন, দেয়ালে ওঠা শুধু কষ্টকরই নয়, বড় মাপের ঝুঁকির বিষয়ও বটে। সম্ভবত এই ‘কষ্ট এবং ঝুঁকি’ এড়াতে চান আমাদের ‘দলবাজ’ বুদ্ধিজীবীরা। দেয়ালে উঠলে দেয়ালের দুপাশের অনেক কিছু যে দেখা যায়! এতে লেখার ভেতর এই দেখাগুলোও ফুটে উঠতে পারে মনের অজান্তে। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই দেয়ালে উঠে লেখা যাবে না। দলীয় দুধকলায় বেড়ে উঠে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে অথবা দু দিকের ভালোমন্দ লিখতে গেলে ‘লাইনচ্যুত’ হওয়ার আশঙ্কা থাকে শত ভাগ। এতে বন্ধও হতে পারে রুটিরুজির রমরমা পথ। অতএব, তাঁদের দর্শন একেবারে সোজা। আর তা হলো সতর্ক অধ্যবসায়ের সাথে নিজ দলের দোষগুলো চেপে রেখে সব দোষ প্রতিপক্ষ দলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া।

তাঁদের মূল এজেন্ডা হলো, যে কোনো মূল্যে পছন্দের দলকে সাফ-সুতরো বা পূতপবিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। দেশ জাহান্নামে যাক, হরতাল-অবরোধে দেশ পঙ্গু হয়ে যায় যাক না! দলের ক্ষমতায় যাওয়াটাই হলো বড় কথা। দল ক্ষমতায় গেলে ঢাকায় ফ্ল্যাট জুটবে, বিদেশ সফরের মওকা মিলবে। দেশপ্রেম? ওটা আবার কী চিজ? একমাত্র বোকাদের মুখ থেকেই দেশপ্রেমের অমৃত বচন ঝরে! আর যাই হোক, দলবাজ বুদ্ধিজীবীরা ‘বোকাদের’ এই কাতার থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছেন।

নিন্দুকেরা বলে থাকেন, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা নাকি দুই প্রজাতির। একদল ক্যাঙ্গারু টাইপের। এরা লাফিয়ে লাফিয়ে ‘আদর্শ’ আর ‘গুরু’ পরিবর্তন করেন। বাকি বুদ্ধিজীবীরা বাদুড় টাইপের। তাঁরা ‘সুযোগ’ বুঝে স্বার্থের ডালে ডালে টুপ করে ঝুলে পড়েন। তবে নীতিগত দিক থেকে দুই প্রজাতিই ‘চান্স-নারায়ণ’। উদ্দেশ্য ছাড়া তাঁরা যেমন বাঁচেন না, তেমনি মরেনও না। হরিদাস পালের মতো অষ্টপ্রহর নেতার স্তুতিই তাঁদের লাইফলাইন।

দেয়ালের উপর উঠুন। দেয়ালটার দুপাশে ভালো করে দেখুন। বুঝতে পারবেন, পতিত এরশাদ দেশের রাজনীতিতে কেন এতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। অথবা তাঁর মাজাভাঙা দলটি দীর্ঘদিন কেন কারো কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকে। স্বৈরাচারী এরশাদ নিজেও জানতেন, ক্ষমতায় থাকতে প্রতিপক্ষ মরিয়া না হলে অথবা ক্ষমতায় থেকে যেতে ধনুভাঙা পণ না করলে তিনি অনেক আগেই তলিয়েই যেতেন।

দেয়ালে উঠলে দেখতে পাবেন, ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনীতির কারণেই এরশাদ রাজনৈতিক জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও ছিলেন সুপারহিট। একই কথা জামায়াতের বেলায়ও খাটে। বিএনপি কিক মারলে দলটি আওয়ামী লীগের কোলে গিয়ে চড়ে। ক্ষমতায় যেতে দলটিকে আওয়ামী লীগও কী সুযোগ পেলে কাছে টানে না? অতীত কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। জামায়াত সুযোগের অপেক্ষায় তক্কে তক্কে থাকে। বিএনপিকে কালারিং করার পর আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে তাদের টার্গেট। বিএনপির সাথে বনিবনা না হলে ওরা সোজা দৌড় দেয় লীগের দিকে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জাতীয় দৈনিকের সাথে সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বয়ান দেন, ‘আমরা মূল্যায়ন করেছি, বিএনপির সঙ্গে থেকে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’ তিনি বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে কোনো সমঝোতা হলে তা ইসলামি আইনকে সামনে রেখেই হবে। যারা ইসলামি আইন চায়, কেবল তাদের সঙ্গেই সমঝোতা করব।’ বিএনপির সাথে জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আপাতত জোটের সম্ভাবনা নেই। তবে চূড়ান্ত কথা বলা যায় না।’ সাধে কি আর বলে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কিছু নেই!

দলীয় চশমা পরে রাজনৈতিক সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করার বাতিক আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাশন। অথচ এটা প্রান্তিক চিন্তনপদ্ধতি। এটা আর কিছু নাই পারুক, দেশের গণতন্ত্রের বারোটা বাজায়। দলীয় নেতারা ভুলের বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান না। দেশের চেয়ে দলকে যাঁরা বড় করে দেখান বা দেখাতে চান, তাঁরা জাতিকে গণতন্ত্র কীভাবে শেখাবেন? এতে দলও গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে উৎসাহ পায় না। দুর্নীতি এ দেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগ তো এভাবেই তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, আসল সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে দেখা যায়, একই কায়দায় বুদ্ধিজীবীদের কলমের খোঁচায় আসল ‘সত্য’ হাজারো মিথ্যার চাপে হা-পিত্যেস করে। প্রতিক্রিয়াশীলদের টিকে যাওয়ার সূত্রটা কিন্তু এখানেই।

বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীর মুখে ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থানের কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়। তাঁরা মাঝে মাঝে জাতিকে এটাই সবক দিতে চান, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি নামের শাসক শ্রেণির দল দুটোর রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই নাকি এ দেশে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। আবার তৃতীয় শক্তির উত্থানটাকে আকারে ইঙ্গিতে সমর্থন জানান সুশীল সমাজের ‘বাদুড় অংশ’। ওয়ান-ইলেভেনকালে অভিযোগ উঠেছিল, বিদেশি এক রাষ্ট্রদূতের বাসায় নাকি ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থান কনসেপ্টটির জš§। সেনাবাহিনী ও সোকল্ড বুদ্ধিজীবী এবং পতিত রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এ দেশে আফগান স্টাইলে ‘কারজাই’ মার্কা সরকার বানিয়ে মার্কিন স্বার্থ পাকাপোক্ত করাই নাকি এ তৃতীয় শক্তির উত্থানের পেছনের কাহিনি। ধারণাটি অবশ্য হালে তেমন পানি পায়নি। কিন্তু শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মাত্রাজ্ঞানহীন ক্ষমতাপ্রীতির কারণে তৃতীয় শক্তির উত্থানটা হয়তো আবার মাথাচাড়া দিতে পারে, এমন আশঙ্কা অনেকে উড়িয়ে দেন না।

মনে পড়ে, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূস যোগ্যপ্রার্থী আন্দোলনের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজনৈতিক দল গঠনের পথে এগিয়ে গিয়েও পিছিয়ে এসেছিলেন। তবে উনি চোখে এনজিওর চশমা এঁটে যোগ্য প্রার্থী চেয়েছিলেন। জনগণও যোগ্য প্রার্থী চায়। জনতারই জয় হয়। তবে হাঁটতে হবে বহুদূর।

দেয়ালে উঠে না লেখাটাই আমাদের কালচার। আর যাঁরা দেয়ালে উঠে দেয়ালের দুপাশে ভালো করে চোখ বুলিয়ে লিখতে চান, তাঁদের প্রচেষ্টাকে ‘কালচার’ না বলে ‘এগ্রিকালচারের’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কারণ আমাদের সমাজে ভিলেনরাই এখন সক্রেটিস। যাঁরা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান, তাঁদের বলা হয় ‘হরিদাস পাল’। নিদেনপক্ষে বলা হয় ‘কুনো ব্যাঙ ঠুঁটো জগন্নাথ’। এখানে দেশপ্রেম মাপা হয় বিদেশিদের প্রেসক্রাইবড নিক্তিতে। বিদেশি প্রভুরা যা বয়ান দেবেন, সেটাকেই বেদবাক্য হিসেবে মেনে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো জাতি ভিন্ন জাতির রাজনৈতিক দাসত্ব মেনে নেওয়ার বহু আগেই সেই জাতিটির সাংস্কৃতিক দাসত্ব কবুল করে নেয়। দাসদের তো আর চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। দাসদের চিন্তার স্বাধীনতা থাকা জরুরিও নয়। পৃথিবীর সব যুগেই দাসেরা মীরজাফরদের কষে স্যালুট দেয়। সিরাজউদৌলারা কখনই সাংস্কৃতিক দাসদের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নিতে পারে না। সবচেয়ে ভয়ানক হলো মিডিয়ার সাংস্কৃতিক দাসত্ব। এই দাসত্বের খোলনলচের গড়ন বেশ জটিল। আবার মিডিয়া সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বকে শুধু লিগ্যালাইজড করে না, এই জাতীয় দাসত্বকে বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দীপনার সাথে সামনে এগিয়ে নিতেও সচেষ্ট থাকে। তাই সব ধরনের দাসত্ব থেকে মুক্তির লড়াইটি সব সময় আমাদের বৈশ্বিক জীবন থেকেও অনেক বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে। হয়তো আমরা সভ্যতার সবচেয়ে অসহায় শিকার।

আসলে দেয়ালে উঠে লেখা কি সম্ভব? কে জানে? কথাটা এক বুদ্ধিজীবীকে জিজ্ঞেস করতেই যা জবাব পেলাম তাতেই আক্কেল গুড়ুম, ‘রাখো তোমার নিরপেক্ষতা। শুনে রাখো, এ দেশে সত্য বলা আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষে একই কথা।’ কথাটি তিনি হয়তো ভুল বলেননি। তার চেয়ে শুনুন একটি পুরানো গল্প। ঘটনাটি আমেরিকার এবং একশো বছর আগের। কানসাসে এক অপরাধীর ফাঁসি হবে প্রকাশ্যে। ৩৫ হাজার দর্শক ময়দানে হাজির। বিচারক জানালেন, ‘ওয়াশিংটন থেকে একজন সিনেটর এখানে এসেছেন। তার সঙ্গে তুমি পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ পাবে।’

- ‘আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই’, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অপরাধীর দৃঢ়োক্তি।

সিনেটর নিজেই এগিয়ে এসে বললেন, ‘আসলে কি তুমি আমার কথা শুনতে আগ্রহী নও?’

- ‘অবশ্যই শুনতে চাই। তবে আমার ফাঁসির পর’- অপরাধীর নির্লিপ্ত জবাব।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)