সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একসময় কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে জুমার দিন মসজিদে জায়গা না হলে রাস্তায় নামাজ পড়তেন অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, এখন সরাসরি মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও সামনে আসছে।
এর জেরে শুক্রবার কোলকাতা ও সংলগ্ন বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি। আজানের ধ্বনি না পৌঁছানোয় বহু মুসল্লি ঠিকমতো নামাজেও যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক ও হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এদিন কোলকাতার পার্ক সার্কাসের এক ইমামের কণ্ঠে এই করুণ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। চরম অসহায়তার সুরে তিনি বলেন, ‘মাইক কেড়ে নিয়ে আমাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করা হচ্ছে। আমরা সব সহ্য করব, কারণ আমাদের আর কিছু করার নেই। শনিবার (১৫ আগস্ট) আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, সবাই নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করুন। না হলে এই সরকার মুসলমানদের গায়ে খুব সহজেই দেশদ্রোহীর তকমা সেঁটে দেবে।’ তার এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রাজ্যের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে বর্তমানে কতটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে।
এরইমধ্যে মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার এই বিতর্কিত বিষয়টি গড়িয়েছে কোলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার কোলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ ছাড়াই শুধু মৌখিক নির্দেশে পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদের মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চের পুরোনো রায়ের প্রসঙ্গ টেনে সব মসজিদে পুনরায় মাইক লাগানোর অনুমতির আবেদন জানান। পাশাপাশি, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে কেন এমন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি জানান, শুধু হুগলির চাঁপদানি থেকেই অন্তত ১০০টি মসজিদের পক্ষ থেকে এমন আবেদন আসতে পারে।
অন্যদিকে, রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) আদালতে এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে মাইক খোলার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং কোন পুলিশ কর্মকর্তা এমন নির্দেশ দিয়েছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা নাম মামলাকারী দিতে পারেননি। এ ছাড়া, ৪ হাজার মাইক খোলার অভিযোগ উঠলেও কোনো ইমাম নিজে থেকে এগিয়ে এসে মামলা করেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এএজি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী নির্দেশ না দিয়ে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হোক।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ঠিক কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক খোলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য আদালতে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, আজান দেওয়ার ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারের শব্দবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। আগামী ১৮ আগস্ট মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। তার আগে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান জানানোর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।
এই তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে গত সপ্তাহে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার কোনো নতুন আইন আনছে না; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশিকাই কার্যকর করছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ধর্মীয় স্থান বলতে মন্দির ও মসজিদ—উভয়ই বোঝায় এবং সেই অনুযায়ী ৪২০০টি মসজিদ ও ১০৯৬টি মন্দির থেকে মাইক খোলা হয়েছে।
কিন্তু সরকারের এই পরিসংখ্যানে বিন্দুমাত্র আশ্বস্ত হতে পারছেন না সংখ্যালঘু সমাজ। তারা জানান, এই পদক্ষেপ আসলে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার একটি সুকৌশলী প্রয়াস মাত্র। সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা ভয়ের আবহে শনিবার স্বাধীনতা দিবস পালন করতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা।