সুবর্ণভূমি ডেস্ক
আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, তার একটি খসড়া কপি আমেরিকাভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন হাতে পেয়েছে বলে দাবি করেছে। খসড়াটি যদি অবিকৃতভাবে চুক্তি হিসেবে সই হয়, তাহলে তা হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরাজয়ের দলিল।
১৪ দফা সমঝোতাসম্বলিত সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র; যা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতায়ও ইরান অর্জন করতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, ইরানের পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ৩০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল যোগান দেবে। এতো বিপুল আর্থিক সহযোগিতা এর আগে কোনো দেশ পেয়েছে কি-না সন্দেহ।
এছাড়া সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের রেজিম চেঞ্জ (ক্ষমতা পরিবর্তন) তো দূরের কথা, দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার কথাও বলা নেই। অথচ একতরফা আগ্রাসন শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলেছিল, ইরানের রেজিম চেঞ্জ ও তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সব সক্ষমতা ধুলিস্মাৎ করে দেওয়া তাদের লক্ষ্য। এছাড়া চুক্তি স্বাক্ষর হলে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা হবে। আটকে রাখা মুদ্রাও ফেরত পাবে দেশটি।
সিএনএনের দাবি, তারা এক মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে এই সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া কপি পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে জড়িত আরও দুই কূটনৈতিক সূত্র এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছেন, ফাঁস হওয়া নথিটি চূড়ান্ত সমঝোতার প্রকৃত প্রতিফলন নয়।
খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত রোববার ডিজিটালভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে ৬০ দিনের সময়সীমা কার্যকর হবে।
খসড়া অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির অনুমতি দেবে। পাশাপাশি ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। তবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা খসড়ায় নেই।
চুক্তির ১৪ দফা
১। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।
২। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩। উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালাবে। পারস্পরিক সম্মতিতে এ সময় বাড়ানো যেতে পারে।
৪। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আশপাশের এলাকা থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে।
৫। ইরান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর ও মাইন অপসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
৬। যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
৭। যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে সমাধান করা হবে।
৯। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করবে না।
১০। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবার রপ্তানির অনুমোদন দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও থাকবে।
১১। আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত অর্থপ্রদানে এসব অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।
১২। চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
১৪। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।