যশোর জেনারেল হাসপাতাল: বিতরণে অব্যবস্থাপনা
সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খাবার নিয়ে নতুন করে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় চিকিৎসাধীন রোগীদের খাবার সংগ্রহ করতে অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের নেমে যেতে হচ্ছে দ্বিতীয় তলায়। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ড ও করিডোরে চলাচলের জায়গা না থাকায় ভারী খাবারের ট্রলি তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও খাবার বিতরণে নিয়োজিত কর্মীদের দাবি।
তবে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, খাবার কখন আসে, কখন বিতরণ শেষ হয়ে যায়- অনেক সময় তারা জানতে পারেন না। ফলে নির্ধারিত খাবার থেকেও কেউ কেউ বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন, হাসপাতালে ভর্তি একজন অসুস্থ রোগীকে কেন খাবার নিতে অন্য তলায় যেতে হবে?
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার (১২ ও ১৩ আগস্ট) যশোর জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে রোগী, স্বজন, খাবার বিতরণে নিয়োজিত কর্মী এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খাবার বিতরণ ব্যবস্থাপনার এই চিত্র পাওয়া গেছে।
শয্যা ২৭৮, রোগী প্রায় এক হাজার
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে সার্জারি, প্রসূতি, সংক্রমণ, মডেল, আইসিইউ, সিসিইউ, মহিলা সার্জারি, গাইনি, শিশু পেইং ওয়ার্ডসহ মোট ১৬টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ডে অনুমোদিত শয্যার সংখ্যা ২৭৮। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। অতিরিক্ত রোগীর সবচেয়ে বেশি চাপ রয়েছে মহিলা ও পুরুষ মেডিসিন এবং করোনারি কেয়ার ইউনিটসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তৃতীয় তলার মহিলা ওয়ার্ডের দুটি ব্লকে ৩৫টি করে মোট ৭০টি রোগীর শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ওই দুই ব্লকে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১৬৯। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে অতিরিক্ত রোগীদের ব্যালকনি ও করিডোরে থাকতে হচ্ছে।
চতুর্থ তলার পুরুষ ওয়ার্ডেও একই চিত্র। ঠাসাঠাসি করে রোগীদের থাকতে হচ্ছে। করিডোর ও অন্যান্য ফাঁকা জায়গায়ও রোগীদের বিছানা পাতা হয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসক ও সেবিকাদেরও চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সেবিকারা ওষুধ ও অন্যান্য সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই খাবার বিতরণের সময় দেখা যায়, খাবারের ট্রলি নিয়ে কর্মীরা দ্বিতীয় তলায় নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছেন। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার রোগীদের অনেকের স্বজনকে সেখানে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২৩ বছর বয়সী রিফাতের স্বজন যশোর সদর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে নিয়ম ছিল রোগীর বেডে খাবার দিয়ে আসা। কিন্তু হাসপাতালের কর্মচারীরা এখন ওয়ার্ডে রোগীর বেডে আসেন না। এমনকি চতুর্থ তলায় এসেও খাবার দেওয়া হয় না। দ্বিতীয় তলায় গিয়ে খাবার নিতে হবে- সেটাও অনেক সময় বলা হয় না।’
একই অভিযোগ করেছেন মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগী জাহানারা বেগমসহ অন্য রোগীদের স্বজনেরা। তাদের অভিযোগ, খাবার বিতরণের নির্দিষ্ট সময় ও স্থান সম্পর্কে তারা অনেক সময় জানতে পারেন না। বিশেষ করে করিডোর বা ব্যালকনিতে থাকা রোগীদের কাছে খাবার বিতরণের খবর পৌঁছায় না।
অবশ্য খাবার বিতরণে নিয়োজিত কর্মচারীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ওয়ার্ডের পাশাপাশি করিডোর ও মেঝেতেও রোগী থাকায় অনেক জায়গায় পা ফেলারও সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ভারি খাবারের ট্রলি নিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ওঠা কার্যত অসম্ভব।
তারা জানান, এ কারণে একজন কর্মচারী ওয়ার্ডে গিয়ে মৌখিকভাবে রোগীদের খাবার সংগ্রহের জন্য ডেকে আসেন। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে খাবার বিতরণ করা হয়। কিন্তু ওয়ার্ডের বাইরে করিডোর, ব্যালকনি বা অন্য জায়গায় থাকা রোগীরা অনেক সময় সেই ডাক শুনতে পান না। ফলে তাদের কেউ কেউ খাবার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
১২ বছর পর নতুন ঠিকাদার, খাবারের বরাদ্দ বেড়েছে
খাবার সরবরাহের ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা ছিল। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরের পর হাসপাতালের খাবার সরবরাহে নতুন করে টেন্ডার হয়নি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে টেন্ডার আহ্বান করা হলে অনিয়মের অভিযোগে ঠিকাদার হাফিজুর রহমান শিলু (মেসার্স হাফিজুর রহমান) ২০১৪ সালের ১৬ জুন উচ্চ আদালতে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
এরপর প্রায় ১২ বছর একই ঠিকাদার পুরনো দরে রোগীপ্রতি ১২৫ টাকা মূল্যে খাবার সরবরাহ করে আসছিলেন। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থাই কার্যত নিয়মে পরিণত হয়।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর উচ্চ আদালত থেকে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি পায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর ডিসেম্বরে নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে মেসার্স আসলাম এন্টারপ্রাইজ খাদ্য সরবরাহের কাজ পায়। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন ঠিকাদার খাবার সরবরাহ শুরু করেন। বর্তমানে রোগীপ্রতি খাবারের বরাদ্দ ১৭৫ টাকা।
তবে বরাদ্দ বাড়লেও খাবারের মান নিয়ে রোগী ও স্বজনদের সন্তুষ্টি পুরোপুরি আসেনি। তাদের ভাষ্য, খাবারে স্বাদ কিছুটা বাড়লেও মানের বড় ধরনের উন্নতি হয়নি।
নির্ধারিত মেন্যুতে কী আছে
হাসপাতালের স্টুয়ার্ড শাহজাহান জানান, নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী সকালে রোগীদের ১০০ গ্রাম পাউরুটি, ডিম ও কলা দেওয়া হচ্ছে। দুপুরে ভাতের সঙ্গে ৮০ গ্রাম মাছ বা মাংস এবং ডাল দেওয়া হয়। রাতে থাকে ভাত, সবজি ও ডিম।
আগে রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ ছিল, খাবারের পরিমাণ কম, মান নিম্ন এবং নির্ধারিত মেন্যু অনুযায়ী সব সময় খাবার দেওয়া হয় না। এমনকি খাসির মাংসের পরিবর্তে ব্রয়লার মুরগি বা নিম্নমানের মাছ দেওয়ার অভিযোগও ছিল।
বর্তমানে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, খাবারের স্বাদ কিছুটা বাড়লেও মানের কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। তাদের ভাষ্য, আগের মতোই খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবে ভাতের জন্য তুলনামূলক চিকন চাল ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তরকারিতে মসলা কিছুটা বাড়িয়ে স্বাদ বাড়ানো হয়েছে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের খাবার সরবরাহের জটিলতা শেষ হলেও নতুন করে আরেকটি সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত মেন্যুতে মাংস রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ কোনো দিবস বা উপলক্ষ ছাড়া রোগীদের খাবারে মাংস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে সূত্রটির দাবি।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার হাবিবা সিদ্দিকা ফোয়ারা বলেন, ‘হাসপাতালটি ২৭৮ শয্যার হলেও এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। মানবিক কারণে প্রায় ৬০০ জনের মতো রোগীকে খাবার দিতে হচ্ছে। এই বিশাল সংখ্যক রোগীর অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে আমরা মেন্যুতে মাছ ও সবজি রাখছি।’
তবে হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা যেখানে গড়ে প্রায় এক হাজার বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, সেখানে খাবার দেওয়ার সংখ্যা প্রায় ৬০০-এই ব্যবধানও রোগী ও স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে।
খাবার বিতরণের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসেন শাফায়েত। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আগের চেয়ে অনেক উন্নত মানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে একতলা ও দোতলা ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় খাবারের ভারি ট্রলি ওঠানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ওয়ার্ডের বাইরে করিডোরেও রোগীরা বিছানা পেতে থাকেন। সেখানে ট্রলি তো দূরের কথা, সেবিকা ও চিকিৎসকরাই ঠিকমতো যাতায়াত করে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, এই সমস্যার কারণে খাবার বিতরণকারীরা ওয়ার্ডে গিয়ে নির্ধারিত স্থানে খাবার সংগ্রহের জন্য রোগীদের মৌখিকভাবে ডেকে আসেন। তবে ভবিষ্যতে রোগীদের কাছে গিয়ে খাবার বিতরণের চেষ্টা থাকবে।
রোগীদের সুবিধার জন্য খাবার বিতরণের বর্তমান প্রক্রিয়াটি আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ভাবছে বলে জানান তত্ত্বাবধায়ক।