সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোর জেলায় ৭৩ হাজার ৩১৭ জন শিশুর স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যার মধ্যে এক হাজার ৭২২ জনই নবজাতক। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গত তিনমাস (ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল) সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রয়োজনীয় টিকা না পেয়ে নিয়মিত কেন্দ্র থেকে ফিরে যেতে হচ্ছে অভিভাবকদের। যা নিয়ে জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।
গত ৪ মে থেকে ৭ মে পর্যন্ত যশোর সদর, ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, জেলার দুই হাজার ২৮৩টি অস্থায়ী ও ৮টি স্থায়ী টিকা কেন্দ্রে ইপিআই টিকা সরবরাহ নেই।
সময়মতো টিকা দিতে না পারায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে বলে জানান কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ রনি।
এদিকে, গত তিন মাসে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং দুটি বেসরকারি ক্লিনিকে মোট এক হাজার ৭২২জন শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতাল ৬০৯জন, শার্শার বুরুজবাগান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩৭জন, ঝিকরগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২৩জন, চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৫জন, অভয়নগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২২জন, মণিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২২জন, বাঘারপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৬জন এবং কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৬জন শিশু জন্ম গ্রহণ করে। এছাড়া, দুটি বেসরকারি ক্লিনিকে মোট ২৬২জন শিশু জন্ম নিয়েছে। তবে, জেলায় নিয়মিত টিকা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ৫৯ হাজার ৮৭৩ শিশু।
এর বাইরে বেসরকারি ক্লিনিকে ও বাসা বাড়িতেও নবজাতক শিশু জন্ম নিয়েছে। যার পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে না থাকলেও শিশু জন্মের সংখ্যা আরও বাড়বে। এই শিশুরা এখন পর্যন্ত ইপিআইর টিকা পায়নি।
যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ঘোপেরডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার জানান, তার দুই মাসের নাতিকে বসুন্দিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা দেওয়ার জন্য দিয়ে যান। কিন্তু কেন্দ্র থেকে প্রতিমাসে বলা হয়েছে- আগামী মাসে যেতে। এভাবে টিকার জন্য প্রতি সপ্তাহে নেন্দ্রে আসতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার রুপদিয়া জিরাট গ্রামের আবুবক্কর জানান, গত ৫ মে যশোর জেনারেল হাসপাতালে তার ছেলের একটি কন্যা জন্ম নিয়েছে। ডাক্তার জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ইপিআই কেন্দ্র থেকে বিসিজি টিকা শিশুকে দিতে বলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি।
এছাড়া, উপজেলার একাধিক ভুক্তভোগী অভিভাবকরা জানান, গত ফেব্রুয়ারি থেকে বারবার সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েও টিকার দেখা মিলছে না। স্বাস্থ্যকর্মীরা সরবরাহ না থাকার কথা বলে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বেসরকারিভাবে এসব টিকা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে শিশুদের সুরক্ষা। তাই টিকার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। বিপজ্জনক এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন জেলার সচেতন নাগরিক ও শিশু চিকিৎসকরা।
অপরদিকে, যশোর সদর উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী (এমটিপি) ওহেদুজ্জামান সুমন সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘টিকা শেষ হয়ে গেছে কয়েক মাস হলো। জেলা ইপিআই কেন্দ্রে চাহিদা পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনও সরবরাহ হয়নি। ফলে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
চৌগাছা উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী নিত্যপদ পাল সুবর্ণভূমিকে বলেন, গত তিনমাস থেকে পর্যায়ক্রমে ইপিআই টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে আইভিপি ছাড়া কোনা টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলা ইপিআই কেন্দ্রে চাহিদা পাঠিয়েছি। সরবরাহ পেলে নতুন করে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।
যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মাহাবুবুর রহমান ও শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহাফুজুর রহমানের মতে, নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে হাম, পোলিও এবং নিউমোনিয়ার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সঠিক সময়ে ডোজ সম্পন্ন না করলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।
এদিকে, যশোর সিভিল সার্জন অফিসের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা স্টোরের রেজিস্ট্রার খাতার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইপিআই- এর টিকার মধ্যে গত ১০ মার্চ বিসিজির (যক্ষ্মা) টিকা শেষ হয়ে গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে পিসিভি (নিউমোনিয়া) ও পেন্টাভ্যালেন্ট (পাঁচ রোগের প্রতিষেধক), ওপিভি ও আইপিভি (পোলিও) টিকা শেষ হয়েছে ১০ মার্চ, ১৪ এপ্রিল এমআর (হাম ও রুবেলা) এবং গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে টিসিভি (টাইফয়েড) টিকা শেষ হয়ে গেছে।
এ ব্যাপরে যশোর সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক রবিউল ইসলাম জানান, স্টোরের সকল টিকা শেষ হয়ে গেছে। কেন্দ্রে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এই টিকা যশোর স্টোরে পৌঁছালে দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল কেন্দ্রে সরবরাহ করা হবে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন শাফায়েত সুবর্ণভূমিকে বলেন, হাসপাতালে গত ১৫-২০ দিন থেকে টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে, অন্য যে টিকা আছে সেগুলি দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ইপিআই টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মাসুদ রানা সুবর্ণভূমিকে বলেছেন, টিকা চেয়ে কেন্দ্রে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে টিকা সংগ্রহ করে বর্তমানে ইপিআই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে।