সম্পাদকীয়
যশোরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যা নয়; এটি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে ঢুকে পড়া ভয়াবহ এক নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। পুলিশের তদন্তে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা এই হত্যাকাণ্ডকে এক কল্পনাতীত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। স্বজন হত্যা, অর্থের বিনিময়ে জীবন নেওয়ার চুক্তির মতো ঘটনা আমাদের বর্তমান সামাজিক বিন্যাস ও অপরাধপ্রবণতার গভীরতা বিষয়ে শঙ্কিত করে তোলে।
হতভাগ্য আলমগীর হোসেনের মেয়ের স্বামীই যদি এই হত্যার মূল হোতা হন, তবে তা পারিবারিক বিশ্বাস, সম্পর্কের মর্যাদা ও মানবিক বন্ধনের চরম ভঙ্গুরতার বহিঃপ্রকাশ। এটি শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করা নীতিহীনতা, উচ্চাভিলাষ ও নির্মম স্বার্থপরতার প্রকাশ। যখন নিকটতম আত্মীয়ই নিষ্ঠুর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন, তখন সমগ্র সমাজের জন্য এটি এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই হত্যা ছিল ‘চুক্তিবদ্ধ’ বা ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’। ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি জীবন নেওয়ার এই বাণিজ্যিক লেনদেন সমাজে সন্ত্রাস ও অপরাধের যে অর্থনীতি দানা বেঁধেছে, তারই নির্মম প্রকাশ। এটি প্রমাণ করে যে, অপরাধ এখন শুধু আবেগ বা প্রতিহিংসার বিষয় নয়; এটি একটি সংগঠিত ও লাভজনক ‘পেশা’-তে পরিণত হয়েছে। টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসী সংগ্রহ, অস্ত্র সংগ্রহ ও খুন সম্পাদনের এই চেইন সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি।
যশোরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামাজিক স্খলন, নৈতিক অধঃপতন ও সন্ত্রাসের সংগঠিত রূপের একটি কেস স্টাডি। এর মোকাবিলা কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, মানবিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং অপরাধের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে হবে।