সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতা বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। জীবদ্দশায় তিনি যে জুলুম সহ্য করেছেন, তা ইতিহাসে অতি বিরল।
এই নেতা স্মরণে ১৬ জানুয়ারি রাজধানীতে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হলো। সেখানে দেশের বিশিষ্টজনরা অংশ নিলেন, বেগম জিয়ার জীবনাদর্শের ওপর আলোচনা করলেন। শোকসভায় খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানসহ তার পরিবার-সদস্যরাও হাজির ছিলেন।
এই শোকসভায় ডা. এফ এম সিদ্দিকী একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তার মতে, বেগম জিয়া যখন সরকারি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন তাকে একটি বিশেষ ওষুধ (মেথোট্রেক্সেট) প্রয়োগ করা হয়, যা তার রোগ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োগের সুযোগ নেই। এই ওষুধটিই ‘স্লো পয়জন’ হিসেবে কাজ করে বলে অভিযোগ এনে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বেগম জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নথি জব্দ করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
চিকিৎসক এফ এম সিদ্দিকীর এই দাবি অত্যন্ত গুরুতর। বেগম জিয়াকে যে ক্যাঙ্গারু কোর্ট বসিয়ে বিনাদোষে সাজা দিয়ে নির্জন কারাপ্রকোষ্ঠে রেখে দিন দিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়- এই অভিযোগ অনেক পুরনো। কোনো কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বেগম জিয়ার ওপর স্লো পয়জনিং করা হচ্ছে বলেও শেখ হাসিনার জমানা থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন।
কিন্তু দৌর্দণ্ড প্রতাপ শেখ হাসিনার জমানায় সেই সুযোগ ছিল না। চব্বিশের ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিতাড়িত হওয়ার পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়, তারা প্রথম দফায়ই নির্বাহী আদেশে বেগম জিয়ার সাজা বাতিল করে। তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগও করে দেয় ইউনূস সরকার। ১৬ তারিখ ঢাকায় যে নাগরিক শোকসভা হলো, সেখানে সরকারের একজন উপদেষ্টা হাজির হয়ে বক্তব্যও দেন। ফলে একথা বলাই যায়, এখন অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যেকোনো মানুষের চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানস্বীকৃত। বেগম জিয়াকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়; যা দেশের মানুষ কখনও মানেনি। মৃদুভাষী খালেদা জিয়া কখনও তার এই ব্যক্তিগত বিষয়টি নিয়ে কথা বলেননি। এটি তার অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি যে, প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ না করা।
বেগম জিয়া এখন সমস্ত দেনা-পাওনার ঊর্ধ্বে। কিন্তু তার ওপর জুলুমকারীরা ধরাধামে বর্তমান। যদি ডা. সিদ্দিকীর আশঙ্কা সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের পাওনা অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে। এজন্য সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আমলে নিতে হবে। আমরা বেগম জিয়ার ওপর স্লো পয়জনিং হয়েছে কি না তা অনুসন্ধানে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা করি।