এস এম সাইদুল ইসলাম
অনেক কাল যাবত জেনে এসেছি, ভারত আমাদের সাহায্য না করলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করতে পারতাম না। কথাটি সত্যি। তবে এখন মনে হয় কথাটির উত্তর সরাসরি ‘সত্য-মিথ্যায়’ সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সাহায্যকে আমরা মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি:
মানবিক সাহায্য ও সামরিক সহযোগিতা। মানবিক সাহয্যের বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তবে সামরিক সহযোগিতাকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি।
প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক বিষয়গুলি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্যে সাংগঠনিক সহযোগিতা।
অস্ত্র ও রসদ দিয়ে লজিস্টিক সহযোগিতা।
সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ।
এখন মনে হয় সামরিক সাহায্যের শেষ ধাপটি অর্থাৎ ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ না নিলেও আমরা জয়লাভ করতাম। তার জন্যে সময় বেশি লাগতো।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্যে আমাদের কারো সহযোগিতার দরকার হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করার জন্যে আমাদের উজ্জীবন মন্ত্র ছিল দুটি:
১। আত্মরক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা
২। যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার সাহস।
প্রাথমিক সাফল্য সংহত করা, সম্প্রসারিত করা এবং জনতার জানমাল বাঁচানোর জন্যে আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই সে দেশের জনগণ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ত্রিপুরার মানুষ তাদের জনসংখ্যার সমান সংখ্যক আর্ত বাঙালিকে আশ্রয় দেওয়া শুরু করেছিল সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা, বাসস্থান সংকট উপেক্ষা করে আমাদের ঠাঁই দিয়েছিল। কিন্তু সে সময় যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার মতো সামরিক সাহায্য আমরা পাইনি।
আমাদের রাজনীতিবিদদের অনেকে যখন ভাবছেন ভারত আমাদের যুদ্ধ করে জিতিয়ে দেবে, আমাদের জনতা তখন দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিদ্রোহী সেনা অধিনায়করা সেই মুহূর্তে বৃহত্তর সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় যুদ্ধ এগিয়ে নিয়ে যাবার উপায় খুঁজতে সম্মেলন করছেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে সারাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আকুতি নিয়ে। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধবিদ্যা রপ্ত করেছেন, তবে এরকম প্রাণ উৎসর্গ করার জন্যে উদ্বেল মানুষ দেখেননি। জনতার এই নিঃশঙ্ক মনোভাবকে পাথেয় করে তারা যুদ্ধ জয়ে দৃঢ় সংকল্প হয়েছেন। তাদের সাথে জনতার সম্মিলনে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছে। এই মুক্তিবাহিনীর কোনো কোনো দলকে শুধু গ্রেনেড নিয়ে অপারেশনে যেতে হয়েছে। কোথাও ভরসা ছিল তিনজনের একটি অস্ত্র। আগস্ট মাস পর্যন্ত এর চেয়ে বেশি সমরাস্ত্র সাহায্য করার সামর্থ তাদের ছিল না।
এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধনীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল। তা হলো-
১। গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ব্যতিব্যস্ত করে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের সম্প্রসারণ করা। যেন পাকিস্তানি বাহিনীর জনবলসহ সমরসজ্জা বিভাজিত হতে হতে অবস্থানগুলি দুর্বলতর হয়ে পড়ে।
২। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রথাগত যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
৩। ভারতীয় বাহিনী এই যুদ্ধে সহায়ক বাহিনী হিসাবে থাকবে; প্রয়োজনে তাদের সাহায্য নেওয়া।
মুক্তিবাহিনীর এই পরিকল্পনা যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে ফলপ্রসূ হতে শুরু করে। ৭ জুলাই প্রথাগত যুদ্ধের প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স গঠিত হয়। সেপ্টেম্বরে কে ফোর্স এবং অক্টোবরের ১ তারিখে এস ফোর্স গঠিত হয়।
এদিকে মুক্তিবাহিনীর ছোট ছোট হামলায় নাজেহাল পাকিস্তানি বাহিনী আরও বেশি অঞ্চল তাদের আওতায় আনার জন্যে সেনাবাহিনী সম্প্রসারণের নামে তিনটি ডিভিশনকে ভেঙে সেই একই জনবল ও সরঞ্জাম থেকে আরও দুটি অ্যাডহক ব্রিগেড গঠন করে। এতে তাদের এলাকা সম্প্রসারিত হলেও প্রতিটি অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩১ জুলাই ভোররাতে মুক্তিবাহিনীর প্রথম প্রথাগত আক্রমণ শুরু হয়। সহায়ক বাহিনীর অপ্রতুল ফায়ার সাপোর্ট এবং সমরসজ্জার সীমাবদ্ধতার কারণে মুক্তিবাহিনী সে যুদ্ধে জয়ী না হলেও পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক সক্ষমতায় বিস্মিত হয়। সেই থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে।
৯ আগস্ট রুশ-ভারত সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন হবার পর ভারতীয় সামরিক সহযোগিতা যেমন বৃদ্ধি পায়, মুক্তিবাহিনীর সাফল্যও সেভাবে বাড়ে। আগস্ট মাসের ২৮ তারিখের মধ্যে রৌমারিতে জেড ফোর্সের উদ্যোগে বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে থানা, পোস্ট অফিস এমনকি শুল্ক বিভাগ পর্যন্ত প্রবাসী সরকারের অধীনে কাজ করা শুরু করে।
১৫ নভেম্বর কে ফোর্সের সাথে লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে বৃহত্তর কুমিল্লার সালদা নদী থেকে পাকিস্তানি বাহিনী বিদায় নেয়। এরপর বেলুনিয়া থেকে পাকিস্তান বাহিনী বিতাড়িত হয়।
এরকম সাফল্যের মধ্যেই সহায়ক বাহিনীর স্থলে ভারতীয় বাহিনীকে নিয়ে যৌথবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবং ২২ নভেম্বর চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশি ফর্মেশনের (ব্রিগেড) অধীনস্থ সেক্টরগুলিকে ভারতীয় বাহিনীর অধীনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে তার আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থা ঘুণে খাওয়া আসবাবের মতো হয়ে যায়। ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণ বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
যদি তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়াই আমাদের যুদ্ধনীতিতে অটুট থাকতাম, আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তান বাহিনীকে আমরা যেমন দুর্বলতর করে তুলতে পারতাম, একইভাবে আমাদের নিয়মিত ব্রিগেডের সংখ্যাও বাড়াতে পারতাম। যুদ্ধ হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শত্রু আসা বন্ধ হয়েছিল। পশ্চিম ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নজর দেওয়ার সময়, সুযোগ আরও কমে যেত। এদেশে মুক্তিবীহিনীর হামলায় তাদের সাপ্লাই লাইন পর্যুদস্ত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ আমরা তাদের ভাতে মারা শুরু করেছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা আমরা তখন রক্ত দেওয়া শিখে গেছি। মুক্তি আমাদের ঠেকিয়ে রাখা যেত না। আরও কিছুদিন যুদ্ধ করলে পাকিস্তানি বাহিনীকে আমাদের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হতো। ভারতীয় বাহিনী শেষ মুহূর্তে যোগ দেওয়ায় আমাদের বিজয়টা ছিনতাই হয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার সুযোগ হয়নি।
লেখক: সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। বর্তমানে উত্তর আমেরিকা প্রবাসী।