সম্পাদকীয়
দৈনিক সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের যশোর অফিসের কেনাকাটায় নয়ছয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে পাওয়া নথি অনুসারে, অফিসের সাধারণ ফুল কেনার নামে অনন্ত চারগুণ বেশি মূল্য দেখানো, বিনা দরপত্রে দিনের পর দিন একই দোকান থেকে স্টেশনারি কেনা, আর কম্পিউটার সামগ্রী ও বইয়ের মতো পণ্য কেনায় দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এগুলো সরকারি কার্যালয়ের দুর্নীতির খণ্ডিত অংশ মাত্র; যেখানে কোষাগার থেকে টাকা আত্মসাতের চিত্র দৃশ্যমান।
প্রথমেই আসে ফুল কেনার প্রসঙ্গ। বাজারে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকায় যে ফুল পাওয়া যায়, তার বিল বাবদ সরকারি খাত থেকে পাঁচ হাজার টাকা উত্তোলনের পেছনে টাকা আত্মসাৎ ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। বিক্রেতা নিজেই স্বীকার করছেন, তিনি এতো দামে ফুল বিক্রি করেননি। এরপর কর্তৃপক্ষের আর কোনো কৈফিয়ত চলে না। এই ঘটনা বাংলাদেশে বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ডের’ কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল’ ধরনের ব্যাপার আর কি!
স্টেশনারি দ্রব্য বিনা দরপত্রে একই দোকান থেকে কেনা সরকারি ক্রয় নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই নীতিমালা প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি। একে উপেক্ষা করার মানে হলো, অসাধু চক্রকে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে সরকারি টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়া।
অন্যদিকে, কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য আইটি পণ্য কেনার নামে টাকা খরচের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। আর বই কেনা হয়েছে বলে খাতা-কলমে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে তার অস্তিত্ব মেলেনি।
এই ঘটনা থেকে কিছু স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়। প্রথমত, দুর্নীতি এখনো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান। দুর্নীতিরোধে তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে অসাধু চক্রের তৎপরতা শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে ‘দুর্নীতির আখড়ায়’ পরিণত করেছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজ হলো দেশের শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা। সেই প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গেই যখন কেনাকাটার নামে লুটপাট চলে, তখন তা শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডে কুঠারাঘাতের শামিল। জনগণের করের টাকা শিক্ষায় ব্যয় হয় বলেই এর অপচয় ও লুটপাট মূলত প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চুরির মতো অপরাধযোগ্য। সরকার যদি শিক্ষাখাতে তার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে লুটেরাদের দমন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়তো শিক্ষার উন্নয়নের সব কথাই মুখরোচক বুলি হিসেবে রয়ে যাবে।