যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

প্রাণিজগৎ

পিঁপড়ার ফুসফুস থাকে না

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট,২০২৬, ১১:০০ এ এম
পিঁপড়ার ফুসফুস থাকে না

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ডেঞে পিঁপড়ের মন্তব্য’ নামের রচনায় লিখেছেন, ‘পিঁপড়ে-সমাজ সম্বন্ধে আমার বিস্তর অনুমানলব্ধ আছে। ডেঞেদের সন্তানস্নেহ আছে, অতএব পিঁপড়েদের তা কখনোই থাকতে পারে না; কারণ, তারা পিঁপড়ে, কেবলমাত্র পিঁপড়ে, পিঁপড়ে ব্যতীত আর কিছুই নয়। শোনা যায় পিঁপড়েরা মাটিতে বাসা বানাতে পারে; স্পষ্টই বোধ হচ্ছে তারা ডেঞে জাতির কাছ থেকে স্থপতিবিদ্যা শিক্ষা করছে- কারণ, তারা পিঁপড়ে, সামান্য পিঁপড়ে, সংস্কৃত ভাষায় যাকে বলে পিপীলিকা। পিঁপড়েদের দেখে আমার অত্যন্ত মায়া হয়, ওদের উপকার করবার প্রবৃত্তি আমার অত্যন্ত বলবতী হয়ে ওঠে। এমনকি, আমার ইচ্ছা করে, সভ্য ডেঞে-সমাজ কিছুদিনের জন্য ছেড়ে, দলকে-দল ডেঞে-ভ্রাতৃবৃন্দকে নিয়ে পিঁপড়েদের বাসার মধ্যে বাসস্থাপন করি এবং পিঁপড়ে-সংস্কারকার্যে ব্রতী হই- এতদূর পর্যন্ত ত্যাগস্বীকার করতে আমি প্রস্তুত আছি।’

পিঁপড়া হচ্ছে এমন একটি প্রাণী যে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করেও লাখ লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। প্রায় ১২ হাজার প্রজাতির পিঁপড়া রয়েছে পৃথিবীজুড়ে।

যে কোনো প্রজাতিতেই সাধারণত তিন ধরনের পিঁপড়া থাকে- রানী পিঁপড়া, সৈনিক পিঁপড়া ও শ্রমিক পিঁপড়া। রানী পিঁপড়া ও শ্রমিক পিঁপড়ারা মাদি হয়, অন্যদিকে সৈনিকের ভূমিকা পালন করে মর্দা পিঁপড়ারা। রানী পিঁপড়ার একমাত্র কাজ হলো ডিম পাড়া। শুধু রানী পিঁপড়াদেরই পাখা থাকে। আর মাদি পিঁপড়াই বাসা বা কলোনির সব কাজ করে। তারা খাবার সরবরাহ করে, পিঁপড়ার ডিমের যত্ন নেয়, বাসা তৈরি করে, বাসা পরিষ্কার রাখে এবং বাসাকে রক্ষা করে।

পিঁপড়ারা বিভিন্ন রকম বাসা তৈরি করতে পারে। কেউ কেউ আবর্জনায় বাসা বাঁধে কেউ মাটির নিচে, কেউ মাটির ওপর, কেউ গাছে; আবার অনেকে বাসাই তৈরি করে না। কিছু পিঁপড়া ধুলা ও বালি দিয়ে ঘর বানায়। কিছু পিঁপড়া ধুলাবালির সঙ্গে খড়কুটা মিশিয়ে শক্ত বাসা বানাতে পারে। এসব বাসায় বৃষ্টির পানিও ঢুকতে পারে না। আবার কিছু পিঁপড়া উঁইপোকাদের মতো কাঠে বাস করে।

পিঁপড়ারা সামাজিক পতঙ্গ। দল বেঁধে এরা কলোনিতে বাস করে। কোনো কোনো কলোনিতে এক থেকে দশ লাখ পিঁপড়া থাকতে পারে। মর্দা পিঁপড়ারা কোনো কাজই করে না। তারা কলোনিতে রানীর সঙ্গে সহবাস করে উৎপাদনে সহায়তা করে বংশ রক্ষা করে এবং সহবাসের পরেই মারা যায়। মর্দা পিঁপড়ার আয়ু আট সপ্তাহের বেশি হয় না। এদের একটাই কাজ। আর তা হচ্ছে ভবিষ্যৎ রানীদের সঙ্গ দেওয়া।

রানী পিঁপড়া অন্যদের চেয়ে অনেকটা বড় হয়। রানী যখন যৌবনপ্রাপ্ত হয় তখন সঙ্গ গ্রহণ করে। রানী পিঁপড়া দুই সেট পাখা নিয়ে জš§ায়। বাঁচে প্রায় ২০ বছর। প্রায় হাজার খানেকের মতো ডিম পাড়ে, তবে সব ডিমে বাচ্চা হয় না। পিঁপড়ার ডিমও দেখতে ডিম্বাকৃতির। তবে আকারে খুব ছোট। এক একটা ডিমের দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিলিমিটারের মতো। তবে যে ডিমে ভবিষ্যৎ রানী পিঁপড়া থাকে তা দেখতে অনেক বড়।

পিঁপড়াদের জীবন চার স্তরে বিভক্ত। ডিম, লার্ভা, পুপা ও পূর্ণাঙ্গ পিঁপড়া। ডিমগুলো থেকে উৎপন্ন হয় লার্ভা। লার্ভা পর্যায়ে তাদের কোনো চোখ কিংবা পা থাকে না। কিন্তু তারা খাবার খেতে পারে। বড় পিঁপড়া তাদের খাবার খাওয়ায় এবং দেখভাল করে। লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং অনেকটা মণ্ডের আকার ধারণ করে। এ সময় দেহের ওপরে একটি নতুন চামড়া তৈরি হয়। দেখতে অনেকটা রেশমের গুটির মতো লাগে।

পিঁপড়াদের ফুসফুস থাকে না। ক্ষুদ্র এক প্রকার ছিদ্র দিয়ে অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বনডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। এদের রক্তের রং নেই।

পিঁপড়ারা জীবনের নানান স্তরে নানান ধরনের খাদ্য খায়। ছোট লার্ভারা শুধু তরল খাবার খেতে পারে। তবে বড় হয়ে যাওয়ার পর কিছু কিছু পিঁপড়া খাবার খেতে পারে না। কারণ তাদের চোয়াল কেবল তাদের কাজের উপযোগী হয়ে যায়। খাবার গ্রহণের উপযোগী থাকে না। রানী পিঁপড়া রাজকীয় আপ্যায়ন পায়। কর্মী পিঁপড়ারা রানীর জন্য আলাদা করে এক ধরনের তরল মুখে করে নিয়ে আসে। মর্দা ও রানী পিঁপড়ারা এতটাই অলস যে, কর্মী পিঁপড়ারা তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়।

এক একটা পিঁপড়া তার নিজের ওজনের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ওজনের জিনিস বহন করতে পারে। ব্যাপারটা একটা শিশু তার কাঁধে করে আস্ত একটা মোটর গাড়ি বহন করার সমান।

পিঁপড়ারা কানে শোনে না। মাটির কম্পন অনুভব করেই তাদের কানে শোনার কাজ চালাতে হয়। ফুসফুসের বদলে থাকে সারা গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট গর্ত। সেগুলো দিয়েই শ্বাসকার্য চালিয়ে নেয় ওরা। এরা খুব একটা মারামারি করে না। তবে একবার শুরু করলে শত্রুকে খুন না করা পর্যন্ত থামে না।

মাটি ওলট-পালট করে পিঁপড়া মাটিতে পুষ্টি উপাদানের আবর্তন ঘটায়। আবার কাঠঠোকরা, ভালুক ও মাছের উপাদেয় খাবারে পরিণত হয় এই পিঁপড়াই।

পিঁপড়া ও মানুষের সামাজিক সম্পর্ক সুখকর নয়। তবে পিঁপড়ার সঙ্গে মানব-চরিত্রের কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষের মতো এরাও সামাজিক জীব, কঠোর পরিশ্রম করতে ভালোবাসে। মজার ব্যাপাার হচ্ছে প্রোটিনের উৎস হিসাবে বিশ্বের কিছু অঞ্চলের মানুষ পিঁপড়া খায়। মানুষের মতো এরাও মিষ্টি, ফল, মাংস খেতে ভালোবাসে। বাসাবাড়িতে পিঁপড়ার উপদ্রবের কারণ এটাই।

ইস্ট লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রমাণ পেয়েছেন, পিঁপড়া এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা বাড়ালে মানবদেহে ফাংগাল ইনফেকশনজনিত চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটে যেতে পারে বলে গবেষকরা রায় দিয়েছেন।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তারা মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকার প্রমাণ প্রথমবারের মতো পেয়েছেন। কারণ পিঁপড়ারা একে অন্যকে খাদ্যের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা চেনাতে সাহায্য করে।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘শিক্ষা মানে শুধু অনুকরণ নয়, এর সঙ্গে শিক্ষক ও ছাত্রের ব্যবহার ও আচার আচরণের পরিবর্তনও জড়িত। শিক্ষার সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদান অপরিহার্য। আমাদের জানা মতে, এটাই মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম উদাহরণ। এই প্রত্যক্ষ প্রমাণের সুন্দর দিক হলো পিঁপড়া একটি ছোট প্রাণী। তার মগজ আরো ছোট। মানুষের মগজ লাখ গুণ বড়। তবুও পিঁপড়া শিক্ষা দেওয়া ও শেখা দুটোতেই সমান পারদর্শী।’

পিঁপড়া ফর্মিসিডা গোত্রের অন্তর্গত সামাজিক কীট বা পোকা। কনুই-সদৃশ শুঙ্গ ও স্বতন্ত্র গাঁটের মতো দেহকাঠামোর কারণে পিঁপড়াকে সহজেই শনাক্ত করা যায়।

পৃথিবীর সব জায়গায় পিঁপড়ার দেখা মেলে, একমাত্র এন্টার্কটিকা ও এ ধরনের কিছু অবাসযোগ্য এলাকা ছাড়া। এরা যে কোনো বাস্তুসংস্থানে বিকাশ লাভ করতে পারে। এরা ভূমিগত বায়োমাসের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গঠন করে। এই সাফল্যের কারণ হলো, তাদের সামাজিক সংগঠন, বাসস্থান পরিবর্তনের সক্ষমতা, রসদ জোগাড় করার দক্ষতা এবং নিজেদের রক্ষা করার পারদর্শিতা।

প্রযুক্তিতে অগ্রগামী জাপানের মানুষদের ভূমিকম্পের ছোবল থেকে বাঁচাতে পারেনি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, পিঁপড়ার গতিবিধি লক্ষ্য করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার মাধ্যমে বাঁচানো যেতে পারে মানুষের জীবন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে মানুষ এখনো অসহায়। আর এগুলোর মধ্যে ভূমিকম্প সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ এটা এত দ্রুত ঘটে যে, ক্ষণিকের মধ্যেই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার তথ্য আগেভাগে জানার জন্য। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে জার্মান বিজ্ঞানী উলরিশ শ্রাইবারের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, পিঁপড়া আগাম জানাতে পারে ভূমিকম্পের খবর। তবে সব পিঁপড়া নয়, বরং বিশেষ ধরনের লাল রঙের কাঠ পিঁপড়ারাই পারে এ ধরনের পূর্বাভাস দিতে।

ডুইসবুর্গ-এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ শ্রাইবারের মতে, এই জাতের পিঁপড়াগুলো সাধারণত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বাসা বাঁধে। অর্থাৎ ভূনিম্নস্থ স্তরগুলোর সংযোগস্থলের কাছাকাছি তথা ফাটলের নিকটতম এলাকায় বাসা বাঁধে। তার মতে, গভীর ভূস্তর থেকে উঠে আসা গ্যাস পিঁপড়ার বাসাগুলোকে উষ্ণ রাখে। ভূনিম্নস্থ প্লেটগুলোর ফাটলের কাছে পর্যাপ্ত মাত্রায় আর্দ্রতাও পায় তারা। আর ভূমিকম্পের সম্ভাবনা দেখলে এদের মাঝে বিশেষ ধরনের তৎপরতা দেখা যায়।

তবে আর্মি অ্যান্ট বা সৈনিক পিঁপড়া সব সময় দলগতভাবে বসবাস করে এবং আক্রমণে নামলে পিছপা হয় না। আর যদি কখনো বৃত্তাকার পথ অতিক্রম করে তাহলেই বিপর্যয় দেখা দেয়। প্রতিটি পিঁপড়া তার আগের জনকে অনুসরণ করতে গিয়ে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে এবং ক্লান্তি এলেও পথ চলা থামায় না। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে হাজার হাজার পিপড়া মারা যায়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)