যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ঐতিহ্য

সিঁধেল চুরি এখন ‘ইতিহাসে’

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট,২০২৬, ০৩:০০ পিএম
সিঁধেল চুরি এখন ‘ইতিহাসে’

সিঁধ কেটে চুরি করা ছিল রীতিমতো একটা শিল্পকর্ম। এককালে চুরি ছিল রোমাঞ্চকর ঘটনা। শুধু পেটের খিদে নয়, তখন চুরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো মনের খিদেও। আর সেকারণেই বিভিন্ন সময়ে চৌর্যবৃত্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল শিল্প-সাহিত্যের রসদ। সাহিত্য সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। সেখানেও তাই চুরির বিষয়টি বাদ পড়ে না। শূদ্রক বিরচি ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকে চুরির বিষয়টি বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।

গবেষকরা বলে থাকেন, চৌর্যবৃত্তি হলো এক ধরনের লৌকিক প্রবাহ। তাই এটা সমাজে নানা আঙ্গিকে টিকে থাকে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পাশাপাশি ভাসের ‘চারুদত্তম’ নাটকেও চৌর্যবৃত্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এসেছে। প্রাচীন ভারতে চৌর্যবিদ্যা চতুঃষষ্টিকলার অন্যতম বলে বিবেচিত হতো। বাৎসায়ন তার কামসূত্রে বলেছেন, ‘এমনভাবে সিঁধ কাটতে হবে, যাতে সকালে গৃহস্থ সিঁধের শিল্পকর্ম দেখে চোরের নিন্দা করলেও তার শৈল্পিক গুণের প্রশংসা করে।’ অর্থাৎ সিঁধেল চোরের শৈল্পিকসত্তার স্বীকৃতি শাস্ত্রের পাশাপাশি সাহিত্যেও ঠাঁই পেয়েছে। উল্লেখ্য, ‘ষণ্নুখকল্পম’ নামক চৌর্যশাস্ত্রে চুরিকালে দশ প্রকার অস্ত্র ও সরঞ্জামের কথা বলা হয়েছে। এগুলো ত্রিশূল, শক্তি, খক্ষ, ফাশ, ধনু, শর, পরশু, ঘণ্টা, পতাকা, মুদ্গর ও করক।

অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবিদের অন্যতম রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তার ‘মালিনী নিগ্রহ’তে সিঁধেল চোরদের নিয়ে অসাধারণ কাব্য রচনা করেন। সিঁধেল চুরি হলো সবচেয়ে কঠিন এবং সূক্ষ্ম চুরিবিদ্যা। অনেক দিন ধরে ভক্তি সহকারে একজন গুরুর কছে এ ‘বিদ্যা’ অর্জন করতে হয়। খুবই বুদ্ধিমত্তার কাজ। সাহস এবং শিল্প দুটোই খুব বেশি লাগে এই অপকর্মে।

শাস্ত্রে ‘চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা’, কথাটা তো আর এমনি ঢোকেনি। দশমহাবিদ্যার অন্তর্গত অন্যতম বৃত্তি হলো চুরি। শাস্ত্রকাররা রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, ‘চোর-শাস্ত্র জানলে মানুষের বুদ্ধি বাড়ে, মানুষ চতুর হয়।’ সিঁধ কাটা আবার যেমন তেমন ব্যাপার নয়, খন্তায় করে ধীরে ধীরে শুরু করতে হবে মাটি কাটা। অত্যন্ত নরম ও হিসাবি হাতের কাজ। সঙ্গী লোক দু-হাতে অঞ্জলি পেতে সিঁধের নিচে ধরে থাকবে। মাটি যা পড়বে সব হাতের উপর। হাতভর্তি মাটি হাঁড়িতে করে ফেলে আসতে হবে দূরে। সিঁধ বস্তুটা কিন্তু আজকের নয়। হাজার দু’য়েক বছর আগের লেখায় বলা হয়েছে, সিঁধ সাত প্রকার: পদ্মব্যাকোষ অর্থাৎ ফুটন্ত পদ্মফুলের মতো, ভাস্কর অর্থাৎ সূর্যের মতো গোলাকার, বালচন্দ্র অর্থাৎ কাস্তের আকারের চাঁদের মতো, বাপী অর্থাৎ পুকুরের মতো চৌকোনা, বিস্তীর্ণ অর্থাৎ অনেকখানি চওড়া। এ ছাড়া রয়েছে স্বস্তিকের চেহারার সিঁধ আর পূর্ণকুম্ভের চেহারার সিঁধ।

সিঁধ কাটার কৌলীন্য প্রচারে শর্বিলক মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বের অশ্বত্থামার সিঁধ কেটে পাণ্ডব-সন্তানদের হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন। সিঁধ কেটে প্রথমে পাততে হয় কান। নিশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝে নিতে হয় অন্দরের বাসিন্দাদের গতিবিধি। ব্যাপারটা এককথায় অসাধারণ। যদি মনে হয় কেউ হালকা জেগে আছে তার জন্য আছে ঘুমপাড়ানি মন্ত্র, যাকে চলতি ভাষায় বলে ‘নিদালী মন্ত্র’, বেদের কালে একে বলা হতো ‘অবস্বপনিকা’। এই মন্ত্রে নাকি হালকা ঘুম গভীর হয়, আর জেগে থাকা মানুষ ঘুমে অচেতন হয়ে যায়।

সিঁধ কাটা আর ভেতরে ঢোকার আগে কেউ জেগে বসে আছে কি না বোঝার জন্য ছিল নকল মানুষ প্রবেশ করানোর রীতি। এর নাম ‘প্রতিপুরুষ’। ঘরে ঢুকে প্রথম কাজ দরজা খুলে ভেজিয়ে রাখা যাতে পালাতে কোনো অসুবিধা না হয়। চুরির মাল খুঁজে পাওয়ারও অনেক তরিকা বর্ণিত আছে শাস্ত্রে।

ডিজিটাল যুগে জল এখন অনেক দূরই গড়িয়েছে, ডাকাত-ঠগ-জোচ্চোর এবং ‘সাধু’দের যুগে ক্রমে কুল-মান হারিয়েছে ‘গুণী’ সিঁধেল চোরেরা, সেইসঙ্গে ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে শৈল্পিক চৌর্য রীতিনীতি ও আচার। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে কাঁচাবাড়ির পরিবর্তে পাকাবাড়ি আর চোরের গুরুভক্তি কমে যাওয়ার সাথে সাথে ডাকতি বেশি লাভজনক হওয়ার কারণে সিঁধেল চোরদের বিলুপ্তি ঘটছে।

প্রায় দু-হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষীয় সমাজে অপরাধ বলতে মূলত ছিল শুধু ‘চুরি’। বৈদিক ‘তায়ু’ শব্দ মানে চোর এবং সংশ্লিষ্ট তিনটি শব্দে- স্তেন (মানে চোর, চুরি), স্তেয় (মানে চুরি) এবং অস্তেয় (চুরি না করা)। তায়ু শব্দটি অবশ্য প্রাচীন ইরানীয় জেন্দ-আবেস্তায়ও পাওয়া যায়। এমনকি ইংরেজি thief শব্দটিও তায়ু শব্দের সংশ্লিষ্ট বলে অনেকে মনে করেন। ঋগে¡দে মিলছে চোরেদের কথা, বাইবেলেও রয়েছে তাদের সপ্রসঙ্গ উল্লেখ। ঋগ্বেদের রচনাকালেও প্রধান অপরাধ ছিল চুরি। জাতক-মালা বা অন্যান্য সংস্কৃত সাহিত্যেও উল্লেখ রয়েছে চৌর্যবৃত্তির। বেদের কাল থেকে আজ ইস্তক চলে আসা এই পেশার মানুষকে ভয়ে ও শ্রদ্ধায় কত নামই দিয়েছে তা বলা মুশকিল, তার মধ্যে কিছু শ্রুতিমধুরও, যেমন ‘নিশিকুটুম্ব’ বা ‘স্কন্দোপজীবী’।

এখন জেঁকে বসেছে ডিজিটাল চুরি। ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে এখন জনসাধারণের টাকা বা সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন চুরি হচ্ছে জানালার গ্রিল কেটে, বিশেষ কায়দায় জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইলসহ অন্যান্য ছোট ছোট সামগ্রী, চুরি হচ্ছে চাকরি, মেধার ডিগ্রি, জমিজমা। ডিজিটাল চোরেরা মোবাইল ফোনে বিভিন্ন লোককে ফোন করে বিভিন্ন কথা বলে অ্যাকাউন্টের টাকা ফাঁকা করে দিচ্ছে। সিঁধ কাটা চোরেরা ছিল অশিক্ষিত কিন্তু ডিজিটাল চোরেরা কলমের খোঁচায় গরিবের লাখ লাখ টাকা গিলে বিদেশের মাটিতে গড়ে তুলছে বেগমপাড়া।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)