সুবর্ণভূমি ডেস্ক
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের নিবন্ধিত বা সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে মিয়ানমারের জান্তা-সমর্থিত সরকার। দেশটির দাবি, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাই-বাছাই করা রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন করা হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো মোট আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের নিবন্ধিত বা সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে তালিকায় থাকা এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করতে পারেনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এছাড়া চার হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে নেপিদো।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা হবে না।
এদিকে বাংলাদেশে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশের তথ্যও অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ প্রবেশ করেছে এবং দুই লাখের বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে থেকে গেছে।
তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে প্রায় সাত লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে আসা রোহিঙ্গাদেরসহ বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের শিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছর মেয়াদি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্মত হলেও তা কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাখাইনে চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এতে কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাও কমে আসছে। তহবিল সংকটে শরণার্থীদের খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ শিবিরগুলোতে অপুষ্টি, অপরাধ এবং বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে।
কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা তরুণ দালালদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় প্রতিবছর বহু রোহিঙ্গার মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এরই মধ্যে গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দাবি করেছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ৫ হাজার এবং বাংলাদেশে থাকা সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে।
তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুধু মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমারের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে ২০২৩ সালে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনাও ঘটে। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান সংঘাত এবং অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।