সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাতক্ষীরা জেলায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্প।
লো-ভোল্টেজ ও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার পাশাপাশি সামনে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়া- এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা যায়, জেলায় বর্তমানে তাদের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। তীব্র গরম বা পিক আওয়ারের সময় জেলায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে প্রায় ১৫৮ মেগাওয়াট। তবে, আবহাওয়া ও ঋতুভেদে এই স্বাভাবিক গড় চাহিদা থাকে ১২০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ ওঠানামা করায় সংকট সামাল দিতে কখনো দশ থেকে ২০ শতাংশ, আবার কখনো তার চেয়েও বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরার সাত উপজেলার মাঠপর্যায়ের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, এলাকাভেদে দিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ মিলছে। শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি এলাকার বাসিন্দা জোবায়ের মাহমুদ ও আশাশুনির গদাইপুরের বাসিন্দা কৃষ্ণ ব্যানার্জী জানান, কিছু দিন ধরে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর মাত্র এক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে পাম্প চালানো না যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
তারা আরও জানান, এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। ধানের মিল, মুড়ির মিল ও খাবার পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আশাশুনির মতো মৎস্যপ্রধান অঞ্চলে সময়মতো বরফ তৈরি করতে না পারায় সংগৃহীত মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে মারাত্মক ধস নেমেছে। এছাড়া, ব্যাটারিচালিত ভ্যান চার্জ দিতে না পেরে জীবিকা হারাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। যদিও গত দুই দিনে আশাশুনিতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে সার্বিক ভোগান্তি রয়ে গেছে অপরিবর্তিত।
সুন্দরবন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা এবং হাই ও লো-ভোল্টেজের কারণে বাসা-বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ফ্রিজসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ও মূল্যবান ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে কোল্ড স্টোরেজ, আইসক্রিম ব্যবসায়ী ও ফ্রিজনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংরক্ষিত কাঁচামাল পচে যাওয়ায় তারা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সামনে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। অথচ বিদ্যুৎ না থাকা এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাতে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের এই তীব্র সংকট ও অস্থিতিশীলতার কারণে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) মুহা. আজিজুর রহমান সরকার বলেন, বর্তমানে দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ হলো জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়ছে এবং চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে সরবরাহ ওঠানামা করে। অনেক সময় বিদ্যুৎ ঘাটতি না থাকলে আমরা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দিতে পারি, আবার অফ-পিক বা সন্ধ্যার দিকে চাপ বাড়লে দশ থেকে ২০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়। সাধারণত আমরা এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিয়ে পরবর্তী এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি। নিয়ম অনুযায়ী এক ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়; কোনো গ্রামে তার চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলে বুঝতে হবে সেখানে কারিগরি ত্রুটি বা স্থানীয় কোনো সমস্যা রয়েছে।