এম জালাল উদ্দীন
, পাইকগাছা (খুলনা)
অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও জলাশয়ে পানি থাকায় খুলনার পাইকগাছায় এবার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় খুশি চাষিরা। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর পাট জাগ দেওয়ার জন্য পানির সংকট দেখা দিলেও এবার বর্ষায় খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয় পানিতে ভরে থাকায় সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। ফলে পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে স্বস্তি ফিরেছে কৃষকদের মধ্যে।
ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় অনেক কৃষকই মনে করছেন, উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছায় হারিয়ে যাওয়া পাট চাষের ঐতিহ্য আবারও ফিরে আসতে পারে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা জমি থেকে পাট কেটে নদী, খাল, বিল, নালা ও ডোবায় জাগ দিচ্ছেন। কোথাও পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে, আবার কোথাও আঁশ ধুয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। পাশাপাশি শুকানো পাট আঁশ হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেও দেখা গেছে কৃষকদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পাইকগাছায় মোট ২৮৩ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উপজেলার দশটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে গদাইপুর, হরিঢালী, কপিলমুনি, রাড়ুলী ও পৌর এলাকায় তুলনামূলক বেশি পাটের আবাদ হয়েছে। আবাদ পাটের মধ্যে দেশি, তোষাসহ বিভিন্ন জাত রয়েছে।
কপিলমুনি ইউনিয়নের পাটচাষি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ রবিউল ইসলাম জানান, তিনি এবার প্রায় দশ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার পাটের আঁশ ভালো হয়েছে।
প্রতি বিঘায় চাষ, সেচ, সার, কর্তন ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ খরচ হয়েছে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় দশ থেকে ১২ মণ বা তারও বেশি পাট পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
পাটের পাশাপাশি পাটকাঠির দামও ভালো হওয়ায় এবার লাভের পরিমাণ বেশি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পাট তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও পাট কিনতে শুরু করেছেন।
আবার কেউ কেউ মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের আগাম টাকা বা দাদন দিয়ে পাট কেনার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকদের মধ্যে উৎসাহও বেড়েছে।
কৃষকরা জানান, পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর তাদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এবার বর্ষায় খানা-খন্দক, পরিত্যক্ত ডোবা ও জলাশয়গুলো পানিতে ভরে থাকায় পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা অনেকটাই কমেছে।
কাশিমনগর এলাকার ক্ষুদ্র চাষি শেখ মুজিবর রহমান ও রুহল আমীন শেখ জানান, একই সময়ে পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ধান রোপণের কাজ শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে শ্রমিকের মজুরি কিছুটা বেশি দিতে হচ্ছে।
তবে পাটকাঠির দাম ভালো থাকায় বাড়তি খরচের একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে ছোট এক আঁটি পাটকাঠি ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের মধ্যে পাটবীজের চাহিদা দেখে এ বছর পাটের আবাদ ভালো হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার উৎপাদনও ভালো হয়েছে।
কৃষি অফিস সূত্রে আরও জানা গেছে, সরকারিভাবে পাটচাষিদের সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার কৃষকদের মধ্যে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে পাইকগাছায় পাট চাষের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এতে একদিকে কৃষক লাভবান হবেন, অন্যদিকে উপকূলীয় এ জনপদে আবারও সমৃদ্ধ হতে পারে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী 'সোনালি আঁশ' পাটের চাষ।