যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ম্যারাডোনা: ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ভাঙার গল্প

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : বুধবার, ১৭ জুন,২০২৬, ১১:০০ এ এম
ম্যারাডোনা: ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ভাঙার গল্প

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি আবেগের নাম। আর সেই আবেগের সবচেয়ে বড় প্রতীকদের একজন ছিলেন দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে কার্যত একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জেতানো এই কিংবদন্তি শুধু আর্জেন্টিনার নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের মানুষ ছিলেন।

বাংলাদেশে তখন স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগ পুরোপুরি আসেনি। বিশ্বকাপ মানেই ছিল বিটিভির সম্প্রচার, পাড়ার ক্লাব কোনো বাড়িতে একসঙ্গে খেলা দেখা, আর পছন্দের খেলোয়াড়দের ছবি সংগ্রহ করা। অনেকের প্রিয় দল ব্রাজিল হলেও প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন ম্যারাডোনা। জাদুকরী ফুটবল, নেতৃত্ব আর ব্যক্তিত্ব তাকে পরিণত করেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।

কিন্তু ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ এমন এক ঘটনা উপহার দেয়, যা আজও অনেক ফুটবলপ্রেমীর মনে বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।

নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে প্রত্যাবর্তন

১৯৯১ সালে ইতালির ক্লাব নাপোলিতে খেলার সময় কোকেন পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়েন ম্যারাডোনা। এরপর ফিফা তাকে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। ফুটবল থেকে দূরে থাকা সেই সময়টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি।

তবুও তিনি হার মানেননি। ধীরে ধীরে ফিটনেস ফিরে পান। এদিকে আর্জেন্টিনাও বিপদে পড়ে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে শক্তিশালী দল নিয়েও তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারছিল না। এমনকি ঘরের মাঠে কলম্বিয়ার কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়।

সেই সংকটময় মুহূর্তে আবারও ডাক পড়ে ম্যারাডোনার।তিনি ফিরে আসেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফে নেতৃত্ব দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন। পুরো দেশ যেন নতুন করে আশা খুঁজে পায়।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে নতুন স্বপ্ন

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আসর বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ৩৩, কিন্তু ম্যারাডোনাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন আবারও নিজেকে নতুন করে তৈরি করেছেন।
আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ ছিল গ্রিসের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনা এমন একটি গোল করেন, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। কয়েকটি দ্রুত পাসের পর বক্সের বাইরে থেকে তার বাম পায়ের দুর্দান্ত শট জড়িয়ে যায় জালে।

এরপর ক্যামেরার দিকে দৌড়ে গিয়ে তার উন্মত্ত উদযাপন আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক দৃশ্যগুলোর একটি।
বাংলাদেশের অসংখ্য দর্শক, যারা গভীর রাত জেগে খেলা দেখছিলেন, তারা সেদিন যেন আবার সেই পুরনো ম্যারাডোনাকেই খুঁজে পেয়েছিলেন।

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ নাচ

দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল আফ্রিকার শক্তিশালী দল নাইজেরিয়া। শুরুতেই পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন ছন্দে। তার বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে প্রথম গোল আসে, পরে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার আরেক গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে একটি দৃশ্য সবার নজর কাড়ে। এক নার্সের হাত ধরে হাসিমুখে ডোপ টেস্ট দিতে যাচ্ছেন ম্যারাডোনা। তখন কেউ ভাবতেই পারেনি, এটাই হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ হাঁটা।

চার দিন পর ভেঙে গেল স্বপ্ন। নাইজেরিয়া ম্যাচের চার দিন পর আসে সেই দুঃসংবাদ। ফিফা জানায়, ম্যারাডোনার ডোপ পরীক্ষায় ইফেড্রিন নামের নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে। ফলে তাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ফুটবল বিশ্ব।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব ছিল গভীর। অনেক কিশোর, যারা প্রথমবার বিশ্বকাপ দেখছিল ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে, তারা এই খবর মেনে নিতে পারেনি। পাড়ার আড্ডা, স্কুলের মাঠ, চায়ের দোকান- সব জায়গায় একটাই বিতর্ক, ‘ম্যারাডোনা কি সত্যিই অপরাধ করেছিলেন?’

অনেকের কাছে এটি ছিল প্রিয় নায়কের পতন। আবার অনেকের কাছে ছিল ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার গল্প।

ইফেড্রিন বিতর্ক

ইফেড্রিন এমন একটি উপাদান, যা সাধারণত শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যার ওষুধে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বকাপ চলাকালে ম্যারাডোনা সর্দি-কাশি ও নাক বন্ধের সমস্যায় ভুগছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছিল।

তার দীর্ঘদিনের ফিটনেস ট্রেনার ফার্নান্দো সিগনোরিনি ও চিকিৎসক দলের মাধ্যমে তিনি কিছু ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন। কীভাবে নিষিদ্ধ উপাদান তার শরীরে প্রবেশ করলো, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।

ম্যারাডোনা নিজে বারবার দাবি করেছিলেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য কিছু নেননি। তার সমর্থকদের অনেকেই এখনও বিশ্বাস করেন, ঘটনাটি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।

আর্জেন্টিনার পতন, একটি যুগের সমাপ্তি

ম্যারাডোনাকে হারানোর পর আর্জেন্টিনা যেন প্রাণশক্তিই হারিয়ে ফেলে। গ্রুপ পর্বে বুলগেরিয়ার কাছে হারে এবং পরে নকআউট পর্বে রোমানিয়ার কাছে ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত হয়ে বিদায় নেয়।

যে দলকে অনেকেই শিরোপার দাবিদার ভাবছিলেন, তারা হঠাৎ করেই পথ হারিয়ে ফেলে। আর ম্যারাডোনা? তিনি আর কখনও আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি।

বাংলাদেশের স্মৃতিতে অমর এক বেদনা

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংখ্যা সবসময়ই অনেক। কিন্তু তাদের এই আবেগের বড় অংশ গড়ে উঠেছিল ম্যারাডোনাকে ঘিরে। ১৯৯৪ সালের সেই নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু একটি ফুটবল সংবাদ ছিল না; এটি ছিল হাজারো সমর্থকের ব্যক্তিগত শোকের মতো।

আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পরে যখন ১৯৯৪ বিশ্বকাপের কথা ওঠে, তখন অনেকেই গ্রিসের বিপক্ষে সেই দুর্দান্ত গোল, নাইজেরিয়ার ম্যাচে তার শেষ জাদু কিংবা ক্যামেরার দিকে ছুটে গিয়ে সেই উন্মত্ত উদযাপনের কথা স্মরণ করেন।

কারণ সেই বিশ্বকাপে শুধু একজন ফুটবলার হারিয়ে যাননি। হারিয়ে গিয়েছিল এক প্রজন্মের স্বপ্ন, এক যুগের রোমান্টিকতা, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের নায়ক- দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)