স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
‘তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করতে হলে দিতে হবে আট হাজার টাকা। বিকাশে টাকা ঢুকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিবর্তন হবে একটি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন,’- হোয়াটসঅ্যাপে এমনই বার্তা দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম সাইফুল আলম। এই অভিযোগ হাসানুল কাদির নামে এক ভুক্তভোগীর।
হাসানুল কাদিরের অভিযোগ, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশীপুর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন বদলাতে এই টাকা দাবি করেছেন এস এম সাইফুল আলম। শিক্ষা অফিসের এই কর্মকর্তা মণিরামপুর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন।
হাসানুল কাদির জানিয়েছেন, শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাশীপুর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘকাল ধরে কোনো নির্বাচন ছাড়াই ‘পকেট কমিটি’ দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
হাসানুল কাদিরের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর চিঠি মারফত মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের নির্দেশ দেয়। বিষয়টি আলিম মাদরাসা সংক্রান্ত হওয়ায় তদন্তের ভার পড়ে মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ওপর। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে অনীহা প্রকাশ করেন মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এস এম সাইফুল আলম। এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ গত ১৪ জুন সুবর্ণভূমি পত্রিকায় ও পরদিন একই মিডিয়া আউটলেটের অনলাইন পোর্টালে প্রকাশের পর তাড়াহুড়ো করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন এই কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, অভিযোগকারী হাসানুল কাদির বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, ‘অধ্যক্ষকে সাথে নিয়ে সুকৌশলে কোনো নির্বাচন না দিয়ে মনগড়া পছন্দের তালিকা সংযুক্ত করেছেন। কিন্তু অধ্যক্ষ গভর্নিং বডির অনুমোদনের জন্য যখন বোর্ডে তালিকা পাঠান তখন সভাপতি হিসেবে অভিযোগকারীর নাম এক নম্বরে ছিল। তখন তিনি কেন আপত্তি করেননি এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেননি। এছাড়া অভিযোগকারী সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বলেননি যে, ওই সদস্যকে বিধি-বহির্ভূতভাবে নির্বাচিত করেছেন! তাই কোনো সদস্যের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উল্লেখ না থাকায় তাদের ব্যাপারে মতামত প্রদান করা সম্ভব হলো না।’
‘বাদী, বিবাদী, সাক্ষীগণ এবং প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক নির্বাচন বিষয়ে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগকারী যে অভিযোগ করেছেন তা সঠিক নয় বলে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রতীয়মান হয়,’ বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি স্বচ্ছ হয়নি এমন অভিযোগ তুলে ওই তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন অভিযোগকারী হাসানুল কাদির। এ সময় প্রতিবেদন পরিবর্তন করতে আট হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন এস এম সাইফুল আলম।
হোয়াটসঅ্যাপে এ সংক্রান্ত কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট সুবর্ণভূমির হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, অভিযোগকারী হাসানুল কাদির ওই কর্মকর্তাকে বলছেন, ‘সঠিক প্রতিবেদনটা দেন স্যার’। উত্তরে এস এম সাইফুল আলম লিখেছেন, ‘এখনি তাহলে সাত হাজার টাকা দিয়ে জানাও’।
ভুক্তভোগী হাসানুল কাদিরের দাবি, কথোপকথনের শুরুতে ওই কর্মকর্তা আট হাজার টাকা দাবি করেন। কিছু সময় পর জরুরি টাকার দরকার জানিয়ে একটি বিকাশ নম্বর দেন। সে সময় তিনি সাত হাজার টাকা দিতে বলেন এবং টাকা দিলে বিকেলের মধ্যে প্রতিবেদন পরিবর্তন হবে বলেও আশ্বস্ত করেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইফুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি হ্যাক হয়েছে। পরিচিত বেশ কয়েকজনের কাছে এমন টাকা চেয়ে ক্ষুদে বার্তা দেওয়া হয়েছে বলেও তার দাবি।
ঘুস দাবির বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাহফুজুল হোসেন।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’