যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নদীর মাটিতে চাপা পড়ছে অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল!

জিয়াউস সাদাত

, খুলনা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন,২০২৬, ১২:০০ পিএম
নদীর মাটিতে চাপা পড়ছে অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল!

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং খোদ সরকারি এক উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মযজ্ঞে হুমকির মুখে পড়েছে অসহায় মানুষের জীবন।

নদী সচল করার মহাপরিকল্পনা এখন রূপ নিয়েছে শতাধিক ভূমিহীন পরিবারের আর্তনাদে। নদী খননের মাটিতে চাপা পড়ছে অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, এখন তারা ঘরছাড়া।

মানবিক বিপর্যয়ের এ চিত্র খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের। তবে ইতিমধ্যেই মাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট ছোট দু’কক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা ঘর আর সেই জমির মালিকানা, এতটুকুই ছিল খুলনার ডুমুরিয়ার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নদীভাঙন, চরম দারিদ্র্য আর ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার যে শেষ আশ্রয়স্থল তারা পেয়েছিলেন, আজ তা ধ্বংসের মুখে। আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া বুড়িভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা। নদী খনন করতে গিয়ে যত্রতত্র মাটি ফেলায় কোথাও ঘরগুলোর ওপর আস্ত মাটির পাহাড় তুলে দেওয়া হয়েছে, আবার অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের কারণে নদীগর্ভে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে বহু ঘর।

কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের খাবার পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েলের মধ্যে দুটিই ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েছে এই নদী খনন কর্মসূচিতে। বেশিরভাগ টয়লেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে খনন সময়ই।

খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ যৎসামান্য আসবাবপত্র আছে তাও বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে এনে রাখে প্রহর গুণছেন কখন তার শেষ সম্বলটুকু ভেঙে পড়বে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। যারা একসময় রেললাইনের ধারে বা অন্যের বারান্দায় রাত কাটাতেন, তারা পেয়েছিলেন একটি স্থায়ী ঠিকানা।

যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ পাঁচটি নদ-নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ দেয় সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মাধ্যমে এই নদী খনন শুরু হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদী খননে ভেঙে ফেলা হয় ৮০ পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থল। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সব ঠিক করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো মে মাসজুড়ে নতুন করে বিপাকে পড়েন কাঁঠালতলার ২৬ পরিবার এবং খর্নিয়া উপজেলার আরও ২৫ পরিবার।

রোববার ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচন্ড চাপে ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। নদী খননের মাটি যেভাবে ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে পুরো ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচন্ড গরমে একদিকে যেমন ঘরে থাকার উপায় নেই, অন্যদিকে মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। এখানকার বাসিন্দারা এখন অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার রান্না করার জায়গা নেই, শিশুদের নিয়ে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয় নেই।

কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৬৫) বলেন, ‘নদীতে ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম বাবা। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাদা মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম। জিনিসপত্র সব বাইরে এনে রাখছি।’

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানি খাওয়ার কল ছিলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে দুটি। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি টিউবওয়েল।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়ার কাঁঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে গেছে। এই নদী খনন প্রকল্প যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সোনাবাহিনীর তত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি। ওনারা বিষয়টি অবগত, খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া চুকনগরের যে পরিবারগুলো ছিলো, তারা ওই পাশের হাটের জায়গায় বসবাস করছে। কিছুদিন আগে কয়েকটি পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সেখানে যাননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তবে খনন প্রকল্পের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুনুর রশিদ বলেন, নিলামে বিক্রয়কৃত নদী খননের মাটি ঠিকাদারের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলার কথা ছিল। আর এটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। কিন্তু তারা সময়মত মাটি সরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। গত দুই মাস ধরে মাটি জমা হওয়ায় বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যায়। যেহেতু জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ হস্তান্তর করতে হবে। এ কারণে কাজের গতিও কমানো যায়নি। যাহোক বিষয়টি অবগত হওয়ার পর ইতিমধ্যেই মাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

একইসঙ্গে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে সমাধান করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)