সম্পাদকীয়
মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ব্যাধি; যা আমাদের যুবাদেরকে গ্রাস করছে। বুধবার সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত ‘নেশার ভয়াল গ্রাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি দেশ, বিশেষ করে যশোর অঞ্চলে মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে এক মায়ের সাক্ষাৎকারে যে করুণ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে, তা আসলে সামগ্রীক চিত্রের প্রতীকী রূপ। তার মতো হাজারো মা সন্তানকে মাদকের কালো থাবা থেকে ফিরিয়ে আনতে গুমরে কাঁদছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না কোনো সমাধান।
সাম্প্রতিক একটি যৌথ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ, যার মধ্যে ৬৫ লাখের বেশি তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, দেশের মোট যুব জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকের জালে আটকা পড়েছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আগে যেখানে আসক্তির সর্বনিম্ন বয়স ১৫-১৮ বছর ছিল, বর্তমানে তা কমে ১২-১৪ বছরে নেমে এসেছে।
যশোরের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে মাদক সহজলভ্য। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের পাশাপাশি এখন ‘টাফেনটা’ ও ‘উইনকোরেক্স’ নামে নতুন মাদকও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় মাদকে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌতূহলই মাদকাসক্তির প্রধান কারণ। বন্ধুদের প্ররোচনা, মানসিক হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা অথবা পারিবারিক অশান্তি মানুষকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু যখন কেউ প্রথমবার কৌতূহলবশত নেশা করে, তখন ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয় এবং এক পর্যায়ে তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে।
মাদকাসক্তির পরিণতি সুস্পষ্ট। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার স্বাস্থ্য, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হারায়। পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়, সন্তানরা অস্বস্তিকর পরিবেশে বড় হয়, এবং সমাজে অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, মাদকাসক্তির কারণে অনেক সময় হত্যার মতো জঘন্য অপরাধও ঘটে।
যারা মাদক থেকে মুক্তি পেতে চান, তাদের পথও মসৃণ নয়। একজন মানুষ যখন রিহ্যাব থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে, তখন সমাজ ও পরিবার যদি তাকে সন্দেহের চোখে দেখে, তবে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং হতাশ হয়ে পুরনো জগতে ফিরে যান।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। মাদকাসক্তকে অপরাধী হিসেবে নয়, বরং ‘অসুস্থ’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং। কিন্তু দেশে বর্তমানে সরকারি নিরাময় কেন্দ্রের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। যশোরের মতো জেলায় মাত্র দুটি বেসরকারি কেন্দ্র রয়েছে, যার শয্যা সংখ্যা অপ্রতুল। এই কেন্দ্রগুলোতে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরও নতুন কেন্দ্র স্থাপন জরুরি।
সন্তানকে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব পরিবারের। সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, খরচ বৃদ্ধি, রাতে জেগে থাকা- এসব লক্ষণ দেখলে পরিবারকে সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় পারিবারিক অবহেলার কারণেই নিরাময় হওয়া ব্যক্তিরা আবার মাদকে ফিরে যায়। সে কারণে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। রিহ্যাব থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিকে যদি সমাজ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে, তবে তিনি কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। প্রত্যেকের উচিত তাদের দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া।
মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে তাদের সুস্থ রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার স্বর্ণসময় পার করছি; দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষই তরুণ। এই তরুণদের যদি মাদকের থাবা থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়বে। ভুলে গেলে চলবে না, একটি সন্তান খারাপ হওয়ার অর্থ পুরো পরিবার ভীষণ দুর্ভোগে পড়া।