সম্পাদকীয়
আউশে আশার আলো ‘ব্রি ধান ৯৮’
প্রতিকূল আবহাওয়া, অসময়ে বৃষ্টি, আর শুকানোর অভাবে ধান নষ্ট হওয়ার যে বাস্তবতা বাংলাদেশের কৃষকদের নিত্যদিনের সঙ্গী, সেই চিরচেনা দুশ্চিন্তাকে জয় করে এবার যশোর সদরের চাষিরা নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। ‘ব্রি ধান ৯৮’-এর অভাবনীয় সাফল্য এবং কৃষি অফিসের সরবরাহ করা আধুনিক ড্রায়ার মেশিনের সহায়তা প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদই পারে খাদ্য নিরাপত্তার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ানো প্রকৃতির বিরূপতাকে জয় করতে।
স্বল্প জীবনকাল ও উচ্চ ফলনশীল ‘ব্রি ধান ৯৮’ যশোরের কৃষকদের মধ্যে যে উৎসাহ ছড়িয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী একটি দিকনির্দেশনা। ১০৫ থেকে ১১২ দিনের মধ্যে ঘরে তোলা যায় এই ধান, যা কৃষককে বছরের বাকি সময়টাতে আরও অন্তত দুটি ফসল- আমন ও ইরি- চাষের সুযোগ দেয়। এতে কেবল জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, একই জমি থেকে বছরে তিন ফসল তোলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথও সুগম হয়। অন্যদিকে, এই ধানের চালের বাজারে চাহিদা, সুস্বাদু ভাত এবং উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ (প্রায় ৯ শতাংশ) হওয়ায় এটি যেমন অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি পুষ্টির ঘাটতি দূর করতেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কিন্তু শুধু ভালো জাতই যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা। বর্ষার প্রকোপ আর রোদের অভাবে ধান পচে যাওয়ার যে আতঙ্ক কৃষকদের তাড়া করে বেড়ায়, সেই আতঙ্ককে বিদ্যুতায়িত ড্রায়ার মেশিন বিদায় দিয়েছে। বাড়তি কয়েক হাজার টাকা খরচ হলেও, বৃষ্টিতে ভেজা ধান দ্রুত শুকানোর এই প্রযুক্তি কৃষকের পরিশ্রম ও ফসল- দুটোই রক্ষা করছে। আসলে প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আজ কৃষির অপরিহার্য অংশ।
এই সাফল্য প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে যদি প্রতিটি ইউনিয়নে কিংবা কৃষক সমবায় সমিতির মাধ্যমে ড্রায়ার মেশিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আমন ও আউশ মৌসুমে ফসল নষ্টের যে আশঙ্কা, তা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ‘ব্রি ধান ৯৮’-এর বীজ উৎপাদন বাড়ানো এবং সম্প্রসারণে আরও জোর দিতে হবে, যেন খরা বা অনাবৃষ্টি-বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এই স্বল্পমেয়াদি জাত কৃষকের ভরসা হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং ফসল ঘরে তোলা থেকে শুরু করে তা সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ছোঁয়া প্রয়োজন। যশোরের এই সাফল্য পুরো দেশের কৃষিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন সময় এসেছে, এই দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করে সারাদেশে কৃষিকে লাভজনক, টেকসই এবং আধুনিক করার পথে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ, যদি কৃষক বিজয়ী হন, তবে সেই বিজয়ের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশের খাদ্যভাণ্ডারে।
স্বল্পমেয়াদি এই জাতের ধানক্ষেতে শাকসবজি, ডাল, তেলজাতীয় ফসলের সমন্বিত চাষাবাদ কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়েও গবেষণা করতে হবে। কারণ আমাদের খাদ্য চাহিদার তুলনায় জমি কম।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা আমাদের সবার অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।