সম্পাদকীয়
একুশ শতকের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং শিল্প খাতের বড় অংশজুড়ে এখন আধিপত্য বিস্তার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক কারিগরি দক্ষতা। তথ্যপ্রযুক্তির এই অভাবনীয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে স্রেফ শ্রেণিকক্ষের সনাতন তাত্ত্বিক শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।
আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সাথে গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার যে ব্যবধান বা ‘স্কিল গ্যাপ’ রয়েছে, তা দূর করাই এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে গবেষণা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি তিনটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ‘পিএসডিআরআই’, দেশের শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন’ এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘সেন্ড এ লিটল হোপ, ইউকে’-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে নিঃসন্দেহে এক সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ।
একটি আধুনিক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা অর্জিত জ্ঞান সরাসরি সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োগ করতে পারবে। যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীরের বক্তব্যেও সেই সত্যটি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে- তাত্ত্বিক শিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দূরত্ব দূর করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এই চুক্তির বড় সাফল্য নিহিত রয়েছে এর বহুমুখী কাজের পরিধিতে। একদিকে প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এআই-এর সঠিক ব্যবহার ও আধুনিক কারিগরি প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক মানের প্রশিক্ষণ পাবে; অন্যদিকে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ও সেন্ড এ লিটল হোপ-এর যৌথ অংশগ্রহণে তৃণমূল ও মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করার সরাসরি সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মসংস্থানের যেমন দিশা পাবে, তেমনি এআই ও আধুনিক প্রযুক্তির মানবিক ও কল্যাণমুখী প্রয়োগের সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
বর্তমান বিশ্ব প্রতিনিয়ত এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে। তবে প্রযুক্তি শেখার পাশাপাশি তা কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ, টেকসই পুনর্বাসন এবং বেকার যুবসমাজকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় রূপান্তর করার এই যৌথ পরিকল্পনা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে, যা তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের দেশে সমঝোতা স্মারক সই হওয়া কেবল প্রাথমিক সাফল্য মাত্র; এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করে চুক্তির পূর্ণ ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই, এই চুক্তি কেবল ফাইল কিংবা প্রশাসনিক কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে একটি সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেবে। যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা যেন গুণগত প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক ইন্টার্নশিপ এবং বিশ্বমানের গবেষণায় অংশগ্রহণের নিয়মিত সুযোগ পান, তা সুনিশ্চিত করতে হবে। অ্যাকাডেমিয়া ও ফিল্ড-লেভেল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের এই দূরদর্শী মেলবন্ধন শুধু যবিপ্রবিকে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।