মানবদূতের ভালোবাসায় বদলে গেল এক পরিবারের ভাগ্য
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
একসময় তাদের ঠিকানা ছিল মাছের ঘেরের ভেড়ির পাশে তৈরি করা একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়তো মাথার ওপর, শীতের রাতে কাঁপতে কাঁপতে কাটতো সময়, আর ঝড় এলেই বুকের ভেতর বাসা বাঁধতো অজানা আতঙ্ক। ভূমিহীন ও হতদরিদ্র মৌলুদা খাতুন এবং তার স্বামী গোলাম মোস্তফার কাছে জীবন ছিল বেঁচে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম।
দুবেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে নিজের জমিতে একটি নিরাপদ ঘরের স্বপ্ন দেখাও ছিল বিলাসিতা।
সেই অসম্ভব স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে মানবতার দুই মহান বন্ধু ভিনসেনজো ফালকোনে এনজো ও গ্রাজিয়েল্লা মেলানো লাওরার হাত ধরে।

মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট তাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই টানেই ইতালি থেকে এদেশে ছুটে এসেছিলেন তারা। তারপর কেটে গেছে কয়েক দশক। বয়স আশির কোঠায় পৌঁছে গেলেও থেমে যাননি। মানুষের জন্য ভালোবাসা আর সেবার অঙ্গীকার নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস। তাদের প্রতিষ্ঠিত ঋশিল্পীর মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান ও মানবিক সহায়তার নানা কর্মসূচিতে উপকৃত হয়েছেন দেশের কয়েক লাখ প্রান্তিক মানুষ। অসংখ্য পরিবার পেয়েছে নতুন আশ্রয়, নতুন জীবন এবং নতুন করে বাঁচার সাহস।
সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পারকুখরালি গ্রামের মৌলুদা খাতুনের পরিবারের অসহায় জীবনযাত্রার কথা জানতে পারেন এনজো ও লাওরা। ঘেরের ভেড়ির পাশে মানবেতরভাবে বসবাস করা পরিবারটির দুর্দশার কথা শুনে তারা বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নলকুড়া গ্রামে পরিবারটির জন্য জমি কিনে নির্মাণ করেন এক আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। বাড়িতে তিনটি সুপরিসর শয়নকক্ষ, যেখানে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারবেন। রয়েছে একটা আলাদা রিডিং রুম, যাতে শিশুদের লেখাপড়া ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ড্রয়িং ও ডাইনিং রুমসহ আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম এবং বড় পরিসরের রান্নাঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
ঘরের প্রতিটি অংশ এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে একটি পরিবার শুধু আশ্রয়ই না, বরং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। জমি কেনা ও ঘর বানানো বাবদ মোট ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫১ টাকা।

বাড়ি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঋশিল্পী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক প্রশান্ত কুমার বল্লভ, কনসালটেন্ট মো. আকতারুল আলম, প্রোগ্রাম অফিসার নাঈমুজ্জামান এবং হিসাবরক্ষক মীর মাহমুদুর রহমান।
নতুন ঘরের চাবি হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মৌলুদা খাতুন বলেন, ‘আমাদের কোনো জমি ছিলনা, কোনো নিরাপদ আশ্রয়ও ছিলনা। আজ মনে হচ্ছে আমরা নতুন জীবন পেলাম। যারা আমাদের এই ঘর দিয়েছেন, তাদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।’
এন্সো ও লাওরা আজীবন মানুষকে যত দৃষ্টান্তমূলক সেবা দিয়েছে তা নীরবে। জাহির করে নয়। মানবতার পাশে তাদের সব কর্মকাণ্ড তাই অনন্য ও অসাধারণ। তার বা তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পক্ষে জমির দলিল ও বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন সমাজকর্মী ও সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এটি শুধু একটি বাড়ি নির্মাণের ঘটনা নয়; এটি মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের ভাষায়, অনেকেই সাহায্য করেন, কিন্তু মানুষের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো কাজ খুব কম মানুষই করেন। এনজো ও লাওরা একটি পরিবারকে শুধু ঘর দেননি, তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, সম্মান ও ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দিয়েছেন।
ঋশিল্পী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক প্রশান্ত কুমার বল্লভ বলেন, একটি পরিবারের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করা শুধু দান নয়, এটি মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজ। এনজো ও লাওরা আজীবন সেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছেন।