শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ করে ফেরার পথে ১১ মৌয়ালকে আটক করেছে বনবিভাগ। এসময় তাদের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার কেজি মধুসহ দুটি নৌকাও জব্দ করা হয়। সুন্দরবনে সকল প্রকার বনজীবী ও পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করে এসব মৌয়াল বনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েছিল বলে বনবিভাগের অভিযোগ।
শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধায় পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের টেংরাখালী টহল ফাঁড়ির পিনমারি খাল থেকে নৌকাসহ এসব জেলেদের আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের বানছার উদ্দীন গাজীর ছেলে আমজাত হোসেন (৬৪), হাকিম শেখের ছেলে কামরুল শেখ (৪৫), মতিয়ার রহমানের ছেলে আল-আমিন (৪০), আছান হাবিব (৩৫), রাব্বানী (৩৫), হায়াত আলী গাজী (৫৫), মোবারক শেখ (৩২), বাবলু রহমান (৩০), মনিরুল খাঁ (৩৮), আবিয়ার মালী (৪৫) এবং কবিরুল ইসলাম (৪৫)।
বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আটক মৌয়ালরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে ঢুকে মধু সংগ্রহ করে লোকালয়ে ফিরছিলেন। ফেরার পথে বন বিভাগের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে এক হাজার কেজি মধু জব্দ করা হয়। পরে বন আইনে মামলা দায়ের করে তাদের সাতক্ষীরা আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে আটক হওয়া মৌয়ালদের দাবি, বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর এলাকার বাসিন্দা বনবিভাগের এক দালাল পরিচয়ধারী ব্যক্তি জালাল মোল্লার মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করেই তারা সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ জুন থেকে সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও ওই চুক্তির ভিত্তিতে তারা মধু আহরণের উদ্দেশে বনে যান। পরে শুক্রবার মধু আহরণ শেষে লোকালয়ে ফিরে আসার পথে বনবিভাগের হাতে আটক হন তারা।
আটক মৌয়ালদের কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, টাকা দিয়ে বনে যাওয়ার পরে যদি বনবিভাগই তাদের আটক করে, তাহলে সেই চুক্তির মূল্য কী? এখন তাদের জেল-জরিমানার মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাইছেন।
এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মধু আহরণ শেষে ফেরার পথে টেংরাখালী টহল ফাঁড়ির পিনমারি খাল এলাকা থেকে এক হাজার কেজি মধু ও দুটি নৌকাসহ ১১ মৌয়ালকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আটককৃতদের কাছ থেকে একটি পাসের ফটোকপি পাওয়া গেছে, যা বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে গত ১৫ মে ইস্যু করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী মধু আহরণের পাসের মেয়াদ ১৪ দিন। সে হিসেবে ২৯ মে ওই পাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই তারা বৈধ অনুমতি ছাড়াই সুন্দরবনে অবস্থান করছিলেন।
এদিকে, দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে সুন্দরবনে ঢোকার বিষয়ে জানতে চাইলে এসিএফ মশিউর রহমান বলেছেন, ‘এ ধরনের অভিযোগের বিষয়টি আমি আপনাদের মাধ্যমেই প্রথম শুনলাম। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
অন্যদিকে চুক্তির অভিযোগ অস্বীকার করে জালাল মোল্লা বলেন, গত ১৫ মে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে বৈধভাবে তিনটি নৌকার পাস করিয়ে মধু আহরণের জন্য সুন্দরবনে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দুটি নৌকা বনদস্যুদের কবলে পড়ে। এ কারণে পাসের মেয়াদ শেষ হলেও তারা সময়মতো লোকালয়ে ফিরতে পারেনি। পরে ডাকাতদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে তারা বনসংলগ্ন কাটা এলাকায় আসে। সেখান থেকে টেংরাখালী এলাকায় পৌঁছালে সিপিজি সদস্যরা তাদের আটক করে।
তিনি আরও দাবি করেন, মৌয়ালদের পাসের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হয়ে গেছে। তবে অতিরিক্ত সময়ের জন্য সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের সুযোগ দিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধেরও শিকার হয়েছে। জামায়াত ও বিএনপির দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে সাধারণ মৌয়ালরা এখন বিপদে পড়েছেন।
গত ১ জুন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করে বনবিভাগ।