প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লি সফরে যেতে পারেন বলে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি সূত্র বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে।
এটিকে দ্বিপাক্ষিক সফর বলা হচ্ছে, যার সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ২১ থেকে ২২ আগস্ট। তবে, এই তারিখ দুয়েক দিন এগোতে বা পেছাতে পারে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ভারতের দিক থেকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দিক থেকেও বলা হয়েছে যে তারেক রহমান সফরে যাবেন।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্যাশা রয়েছে।
তার মধ্যে একটি হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ভারতের আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বা বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো যেনো তিনি আর করতে না পারেন।
কর্মকর্তাদের দাবি, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিতর্কের সৃষ্টি করছে এবং তার উদ্দেশ্য হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলা।
তাই, শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ। নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেই এই সফর নিশ্চিতভাবে হবে।
এ বিষয়ে ভারতের দিক থেকে এক ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, তবে পুরোপুরি নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।
ভারতের একটি গণমাধ্যমও জানিয়েছে যে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন তারেক রহমান।
এছাড়া, ভারতের দিক থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে ব্রিকসের সম্মেলন হবে। সেখানে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে, সেই সফরে তারেক রহমান যোগ দিবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
দুই বছর আগে ৫ আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন।
পরে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।
ক্ষমতা হারানোর ঠিক দুই বছর পর গত ৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ, যেখানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে অডিও বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা এবং সরাসরি সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দেন।
তবে, আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকার গণমাধ্যমকে সতর্ক করে যাতে কেউ তার বক্তব্য নিয়ে খবর প্রচার না করে।
পরে ঢাকা অভিযোগ তোলে যে বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে রাতেই বিবৃতিও দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) ওই সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এরপরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশ সরকার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, একইসঙ্গে সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদেরও অনেকে তখন ভারত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাদের সরকার আসলে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড বন্ধ চায়।
এদিকে, শেখ হাসিনা ইস্যুকে সামনে এনে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিরোধিতা করছে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একাংশের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।
‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কীভাবে হবে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নিরূপণ হবে, এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না’- বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ...দিল্লিতে যে প্রেস কনফারেন্স হয়েছে, সেটি ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে হয়েছে...। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা যা কিছু বলছে, সেগুলোকে শেখ হাসিনার ভাষ্য হিসেবে না নিয়ে দিল্লির ভাষ্য হিসেবে নিতে হবে। ভারত এই বার্তা বাংলাদেশকে দিয়ে যাচ্ছে।’
‘বিচারে একটা রায় হয়েছে, সেই আসামিকে যখন প্রেস কনফারেন্স করতে দিয়েছে একটি সরকার; তার মানে এ দেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ভারত সরকার অবস্থান নিয়েছে। এটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ ঘোষণা করার মতো।’