তারেক মাহমুদ
, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ঝিনাইদহে বিদেশি ফল আঙুর চাষ বাড়ছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৬ হেক্টর জমিতে আঙুর চাষ হয়েছে। জেলার মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় দিন দিন চাষ বাড়ছে।
তবে সম্ভাবনাময় বিদেশি এ ফলের চাষটি নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। জেলার কৃষি কর্মকর্তা ও তরুণ উদ্যোক্তরা বলছেন, এই এলাকায় উৎপাদিত আঙুরের স্থায়িত্ব কম। বাগান থেকে পাকা ফল সংগ্রহের পর তিন থেকে পাঁচ দিনে পচন শুরু হয়। ফলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বিক্রি করা না গেলে তা নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা আঙুর প্রায় একমাস রেখে বিক্রি করা যায়।
কৃষি বিশেষজ্ঞ, চাষি ও কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে যারা আঙুর চাষ করছেন তাদের প্রধান লক্ষ্য চারা বিক্রি করা। জাতভেদে এসব চারা ৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে থোকায় থোকায় ধরে থাকা দৃষ্টিনন্দন রসালো আঙুরের সচিত্র প্রতিবেদন আর কাল্পনিক টাকা উপার্জনের গল্প দিয়ে চারা বিক্রি করছেন অনেকে। তবে, টেকসই আঙুর চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা গেলে কৃষি অর্থনীতির বিরাট এক দ্বার উন্মোচিত হবে বলেও মত দিয়েছেন তারা।
জেলার প্রথম আঙুর চাষি মহেশপুরের আব্দুর রশিদ। তিন বিঘা জমিতে ইউরোপ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে চাষ হওয়া বাইকুনুর এবং ট্রাসফিগারেশন চিনের ডাসুনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের দশ থেকে ১২ জাতের প্রায় ৫০০ গাছ রয়েছে তারা বাগানে। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লাল, খয়েরি ও কালো আঙুর দেখতে শত শত দর্শনার্থী ভিড় করেন। তার বাগানে উৎপাদিত আঙুরের স্বাদও বাজারের বিক্রি হওয়া আঙুরের থেকে ভালো। আঙুর চাষে খরচের তুলনায় লাভ বেশি। কিন্তু চারা বিক্রির প্রতি তার ঝোঁক বেশি। চলতি বছর তিনি প্রায় ২০ হাজার আঙুর চারা উৎপাদন করেছেন; যার প্রতিটির খুচরা মূল্য ধরা হয়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। চলতি বছর প্রায় তিনি চারা বিক্রি করবেন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার।
আব্দুর রশিদ ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার যুগিহুদা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। মহেশপুর উপজেলা শহরের পাশ ঘেঁষে বেয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদীর তীরে তার আঙুর বাগানের অবস্থান। ২০২০ সালে প্রথম দশ কাঠা জমিতে ‘ছমছম’ ও ‘সুপার সনিকা’ জাতের ৭৫টি আঙুরের গাছ রোপণ করেন তিনি। এসব গাছ থেকে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ বছর ফল পাবেন বলে জানান কৃষক আব্দুর রশিদ।
সম্প্রতি যশোর সদরের বারীনগর এলাকার সাহাবাজপুর গ্রামের আঙুরচাষি তৈয়ব আলীর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, থোকায় থোকায় ঝুলছে খয়েরি, কালো ও সবুজ রঙের আঙুর। এ বাগানের বয়স মাত্র ১১ মাস। তার দুই বিঘা জমির এই বাগান থেকে প্রথম বছরে প্রায় এক লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। একই বাগান থেকে একই সময়ে উৎপাদিত সাত হাজার চারা বিক্রি করেছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকায়। আরো কয়েক হাজার চারার অর্ডার রয়েছে, কিন্তু চারা প্রস্তুত না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না বলে জানান তৈয়ব আলী।
আঙুরচাষি তৈয়ব আলী বলেন, ‘‘আমার বাগানে উৎপাদিত ‘বাইকুনুর’ ও কালো জাতের আঙুরের স্বাদ অনেক ভালো। ফলের চাহিদাও অনেক। প্রতিদিন প্রচুর কৃষি উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থী আসেন বাগানে। তারা আঙুর খেয়ে খুশি। তবে, তাদের চাহিদামতো চারা দিতে পারছি না। এবছর দশ হাজারের মতো চারা তৈরি করেছিলাম, যা সবই বিক্রি হয়ে গেছে।”
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের গোমরাইল গ্রামে আঙুরের চাষ করেন কলেজছাত্র রাকিব হাসান। এ গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছেন রাকিব। শখের বসে তিনি ‘বাইকুনুর’ ও ‘ব্লাক মেজিক’ জাতের আঙুর চাষ শুরু করেন দুই বছর আগে। ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে ১২০ পিস চারা দশ কাঠা জমিতে রোপণ করার প্রথম বছরের মাথায় এক লাখ টাকার আঙুর উৎপাদন হয়। চলতি বছর সেই বাগান থেকে তিন লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। একই সময়ে দুই লাখ টাকার চারা বিক্রির অর্ডারও পেয়েছেন।
আঙুর চাষ নিয়ে কথা হয় বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জাতের ফলের চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আবিদ নাার্সারির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান মাসুদের সাথে। তিনি বলেন, ‘আঙুর ফল আমাদের দেশে সম্ভাবনাময় হলেও এটা দ্রত পচনশীল। আমাদের আবহাওয়ায় বিদ্যমান তাপমাত্রায় তিন থেকে চার দিনের বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে, আঙুরের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা গেলে হাজার হাজার কৃষি উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক দ্বার খুলে যাবে।’
চটকদার ভিডিও কনটেন্ট দেখে না বুঝে আঙুর চাষে বিনিয়োগ না করার জন্য তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে চারা বিক্রির জন্য হলে বিষয়টি ভিন্ন। আমার দাবি, যত দ্রুত সম্ভব দেশের কৃষি বিভাগ সম্ভাবনাময় এ বিদেশি ফলের টেকশই জাত উদ্ভাবন করুক।’
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তেেরর উপ-পরিচালক মো. কামারুজ্জামাান বলেন, এই জেলার মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য উপযোগী। অনেকে চাষ করে লাভবাান হচ্ছেন। কেউ যদি নিজ উদ্যোগে আঙুর চাষ করেন তাহলে আমরা তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করছি। আমরা কাউকে উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করছি না। কারণ আমাদের আবহাওয়ায় আঙুর দ্রুত পচে যাচ্ছে, ফলে কিছু শঙ্কা থেকেই যায়। যে কারণে টেকসই জাত উদ্ভাবন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আঙুর চাষে উৎসাহ দিচ্ছি না। আমরা চাই না অনভিজ্ঞ কোনো কৃষক লোভে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হোক।’