শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
একদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। বছরের অন্যতম বড় এই উৎসবকে ঘিরে যশোর শহরের বিপণিবিতান, ফ্যাশন হাউস ও মার্কেটগুলোতে এখন থাকার কথা উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। শহরের মুজিব সড়ক, জেসটাওয়ার, চৌরাস্তা, ক্যালেক্টরেট মার্কেট, এইচএমএম রোড, সিটি প্লাজা শপিংমল ও পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক কম। বিক্রি বাড়াতে ব্যবসায়ীরা ৩০ শতাংশ থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিলেও জমে ওঠেনি এবারের ঈদ বাজার।
রবি ও সোমবার যশোর শহরের বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, দোকানের সামনে ঝুলছে ‘ফ্ল্যাট ৩০-৬০% অফ, ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’, ‘ঈদ স্পেশাল ডিসকাউন্ট’সহ নানা অফারের ব্যানার। সাজানো রয়েছে নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শাড়ি, জিন্স, টি-শার্ট ও শিশুদের পোশাক। তবে, বিক্রয়কর্মীদের অনেককেই অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর কিছুটা ভিড় বাড়লেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শহরের মুজিব সড়ক এলাকার একাধিক পোশাক ব্যবসায়ী জানান, গত বছর ঈদের ১০-১২ দিন আগে থেকেই দোকানে ক্রেতার চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এবার ঈদে সেই চিত্র নেই। অনেকে দোকানে এসে শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ছবি তুলে নিয়ে অনলাইনে দাম মিলিয়ে দেখছেন। আবার অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় কেনাকাটার তালিকা ছোট করে ফেলেছে।
শহরের সিটি প্লাজায় অবস্থিত ব্লুজ ফ্যাশনের মালিক খায়রুজ্জামান সুজন বলেন, গত বছর যেখানে প্রতিদিন দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার বিক্রি হতো, এবার সেখানে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ক্রেতারা আগের মতো একসাথে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করছেন না। একজনের কাপড় কিনে অন্যজনেরটা বাদ দিচ্ছেন।
তিনি জানান, আগে একটি পরিবারের ঈদ কেনাকাটার বাজেট ছিল ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। এবার অনেক পরিবার ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করছে। ফলে দামি পোশাকের বিক্রি কমে গেছে।
যশোর শহরের এইচএমএম রোডের ব্যবসায়ী তুহিন হোসেন বলেন, আমরা তিন হাজার টাকার পাঞ্জাবি ছাড় দিয়ে ২১শ’ টাকায় বিক্রি করছি। ৫ হাজার টাকার শাড়িতে এক থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত টাকা ছাড় দিচ্ছি। তারপরও ক্রেতা কম। মানুষ এখন পোশাকের চেয়ে কোরবানির পশু, মসলা আর সংসারের বাজারে বেশি টাকা খরচ করছে। অনেকেই দোকানে এসে প্রথমেই বলেন, ভাই কম দামে কিছু দেখান। আগে যেখানে ব্র্যান্ড আর ডিজাইন দেখতো, এখন সবাই বাজেট দেখে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির ঈদ হওয়ায় মানুষের বড় একটি খরচ চলে যাচ্ছে পশু কেনায়। যশোরের বিভিন্ন পশুর হাটে মাঝারি মানের গরুর দাম এখন ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। বড় গরুর দাম ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। এছাড়াও কৃষক ধান কেটে তা প্রসেস শেষে সময় মতো বিক্রি করতে পারেনি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পোশাক কেনাকাটায় খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
শহরের ক্যালেক্টরেট মার্কেটের সাবা ফ্যাশান হাউজের বিক্রয়কর্মী মানিক মিয়া বলেন, আগে একজন ক্রেতা এসে দুই-তিনটা পাঞ্জাবি কিনতেন। এখন একটা কিনেই চলে যাচ্ছেন। আবার অনেকে বলছেন, ঈদের আগের রাতে আরও ছাড় দিলে তখন কিনবেন।
শহরের পুলিশ প্লাজায় অবস্থিত সাদ ফ্যাশান হাউজের মালিক সুমি শেখ বলেন, মেয়েদের থ্রি-পিসের দাম আগের তুলনায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভালো মানের কাপড়ের দামও বেড়েছে। কিন্তু মানুষ সেই অনুপাতে কিনতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, গত ঈদে যে থ্রি-পিস ২২শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেটির দাম পড়ছে ২৮শ’ থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু ক্রেতারা দুই হাজার টাকার বেশি দিতে আগ্রহী নন।
যশোর শহরের কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো হিসাব করে খরচ করছে।
একটি রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যংকের ব্যবস্থাপক সেলিম রেজা বলেন, একদিকে কোরবানির গরু, অন্যদিকে মসলা, চাল, তেল, পেঁয়াজ, সবকিছুর দাম বেশি। আগে পরিবারের জন্য যে টাকার কেনাকাটা করা হতো এবার তার অর্ধেকের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করছি।
শহরের বারান্দিপাড়া কদমতলা এলাকার গৃহিণী রোজা ইয়াসমিন বলেন, বাচ্চাদের জন্য কিনতেই বেশি টাকা চলে যাচ্ছে। নিজেদের জন্য আগের মতো বেশি কেনাকাটা করছি না। ডিসকাউন্ট থাকলেও সবকিছুর দাম এখনও বেশি মনে হচ্ছে।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক ফেরদৌস জান্নাত বলছেম, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঈদ বাজারে।
যশোরের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, গত কয়েক মাসে বিদ্যুৎ বিল, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। ফলে ব্যবসা কম হলেও খরচ কমছে না।
শহরের মুজিব সড়ক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাদিউজ্জামান বাপ্পি বলেন, বাজারে টাকা প্রবাহ আগের মতো নেই। মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া খরচ করতে ভয় পাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে আছে। ফলে ঈদের বাজারেও সেই প্রভাব পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন ব্যবসাও এখন বড় প্রভাব ফেলছে। অনেকেই ফেসবুক বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে কম দামে কেনাকাটা করছেন। এতে স্থানীয় মার্কেটগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে।